আইইডিসিআরের কার্যালয়ে ঢুকে পরিচালককে মারধর। ছবিঃ সংগৃহীত
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকিকে তাঁর কার্যালয়ের কক্ষে ঢুকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কর্মীদের বিরুদ্ধে। বুধবার বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরিচালকের অভিযোগ, ড্যাবের কর্মীরা দলবদ্ধভাবে তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে তাঁকে মারধর করেন। ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজও সামনে এসেছে, যেখানে কয়েকজন ব্যক্তিকে তাঁর কক্ষে ঢুকে তাঁকে চেয়ার থেকে টেনে তুলে মারধর করতে দেখা যায়।
অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি জানিয়েছেন, ড্যাবের কর্মীরা তাঁর কার্যালয়ে এসে মব সৃষ্টি করে হামলা চালিয়েছেন। অন্যদিকে, ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাঁর ওপর হামলার পেছনে অসন্তোষের কারণ হিসেবে একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন।
প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি নিজের কক্ষে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। এ সময় আট থেকে নয়জন ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর তাঁরা পরিচালককে চেয়ার থেকে টেনে তুলে মারধর শুরু করেন। তবে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং হামলার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ওর (কাজী আহমেদ) ও তো কিছু দোষ আছে।’ পরিচালকের কী দোষ রয়েছে, জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে থাকা একটি ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘এই সরকারের সময় কাজী আহমেদ কী করে মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে তার (কাজী আহমেদ) নিজের অফিসে বৈঠক করে?’
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা একজন জনস্বাস্থ্যবিদ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। করোনা মহামারির সময় সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত ব্রিফিংয়ের কারণে তিনি পরিচিতি পান। পরে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
আইইডিসিআরের পরিচালকের কক্ষে হামলার সময় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন জনস্বাস্থ্যবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হামলাকারীদের তিনি এর আগে কখনো আইইডিসিআরে দেখেননি। ফলে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, নাকি বাইরে থেকে এসেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন এ ঘটনাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের নিজের কক্ষে তাঁকে মারধরের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আইইডিসিআর দেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। দেশে সংক্রামক রোগের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা, জনস্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আইইডিসিআর যৌথভাবে কাজ করে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইইডিসিআরের পরিচালক পদে অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর গবেষণা আলোচনায় আসে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কার্যালয়ে ঢুকে এ ধরনের হামলার অভিযোগ প্রশাসনিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একটি প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা কর্মীদের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।