কিশোরগঞ্জে জামায়াত নেতার ছেলেকে বুকে ছুরিকাঘাত
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জামায়াত নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বড় ছেলে শাহরিয়ার জামান রানাকে ছুরিকাঘাত করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার (৪ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে…
দুই বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হওয়ার অপেক্ষায় দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের ব্যবসায়ী, জেলে, হোটেল-মোটেলকর্মী, নৌযান শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখেমুখে দেখা যাচ্ছে স্বস্তি ও নতুন আশার ঝিলিক। তাঁদের ভাষায়, দ্বীপে যেন আবারও ঈদের আনন্দ ফিরে এসেছে।
বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে সেন্টমার্টিন জেটিঘাটের পাশের একটি মুদিদোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন জেলে মনজুর আলম (৬৫) ও দোকানি হামিদ হোসেন (৬০)। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাঁরা স্মরণ করছিলেন গত দুই বছরের কঠিন সময়ের কথা। পর্যটক কমে যাওয়া, দ্বীপে রাতযাপনে বিধিনিষেধ এবং বেচাকেনা কমে যাওয়ায় কীভাবে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে, সে অভিজ্ঞতার কথা জানান তাঁরা।
মনজুর আলম ও হামিদ হোসেন বলেন, গত দুই বছর সেন্টমার্টিনে পর্যটনের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় তাঁদের সংসারে চরম টানাপোড়েন গেছে। পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ সীমিত হওয়া এবং পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও মন্দা দেখা দেয়। আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এবার পর্যটনের ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় তাঁদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তাঁদের কথায়, দীর্ঘদিন পর এবার ঈদের মতো আনন্দ অনুভব করছেন তাঁরা।
শুধু মনজুর আলম ও হামিদ হোসেন নন, পর্যটননির্ভর এই দ্বীপের অনেক বাসিন্দাই এবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে সংস্কারকাজ চলছে। নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও আবার সচল হবে বলে আশা স্থানীয়দের।
৫ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে জাহাজ চলাচল
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় নির্ধারিত দিনে তা শুরু করা সম্ভব হয়নি। আগামী ৫ নভেম্বর থেকে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন পথে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবর আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। এ সময় রাতযাপনসহ প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন।
এর আগে গত দুই বছর নভেম্বরে পর্যটকদের শুধু দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার সুযোগ ছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারতেন। এবার রাতযাপনের সুযোগসহ পর্যটকসংখ্যা বাড়ানোয় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
আয়ের আশায় দ্বীপে ফিরছেন তরুণেরা
সেন্টমার্টিনে আট বছর ধরে টমটম চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মোহাম্মদ ছিদ্দিক। পশ্চিম সৈকতে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি জানান, গত দুই বছর পর্যটক কম থাকায় তাঁর আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরিবারের আট সদস্য নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বেড়েছে। এবার পর্যটন মৌসুমে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় তিনি আশাবাদী।
মোহাম্মদ ছিদ্দিক বলেন, পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের মানুষের মধ্যে আবারও কর্মব্যস্ততা ফিরেছে। পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন। হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। ঈদের আগে যেমন ব্যস্ততা দেখা যায়, দ্বীপে এখন অনেকটা তেমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এবার আয় বাড়লে অন্তত কিছুটা ঋণের বোঝা কমাতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
দ্বীপের বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন জীবিকার প্রয়োজনে বছরের বেশির ভাগ সময় দ্বীপের বাইরে থাকেন। তবে পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে এবার নিজ এলাকায় ফিরেছেন তিনি। জয়নাল আবেদিন বলেন, দ্বীপে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় তাঁর মতো অনেক তরুণকেই জীবিকার সন্ধানে বাইরে যেতে হয়েছিল। এবার পর্যটনের বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ায় তাঁদের অনেকে আবার ফিরে আসছেন।
তিনি জানান, অন্তত দুই শতাধিক তরুণ পর্যটকদের ছবি তোলার কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফটোগ্রাফির পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালানোসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন অনেকে। এতে দ্বীপে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা তরুণ রহমত উল্লাহও পর্যটকদের পরিবহনসেবা দিয়ে বাড়তি আয়ের আশায় মোটরসাইকেল নিয়ে সেন্টমার্টিনে এসেছেন। পুরো পর্যটন মৌসুম দ্বীপে থাকার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। রহমত উল্লাহ বলেন, মোটরসাইকেলের পাশাপাশি টমটমও ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। এবার আগের তুলনায় আয় বাড়বে, এমন প্রত্যাশা থেকেই মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপে চলে এসেছেন।
পর্যটনের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি
স্থানীয়দের মতে, বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এই প্রবালদ্বীপের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কেউ দোকানপাট পরিচালনা করেন, কেউ মাছ ও সামুদ্রিক খাবার বিক্রি করেন। আবার অনেকে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ কিংবা নৌযানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে তাঁদের আয়ে। গত দুই মৌসুমের স্থবিরতা কাটিয়ে এবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, জাহাজ চলাচল শুরু হলে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় আবারও গতি ফিরবে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুম তাঁদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো। বছরের আয়ের বড় একটি অংশ এই মৌসুমকে ঘিরেই আসে। তবে শুধু পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল না রেখে দ্বীপের মানুষের টেকসই জীবিকার জন্য সরকারি উদ্যোগে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ জেলে ও পর্যটননির্ভর। এখানে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। জীবিকার তাগিদে অনেকেই প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার চালান। তাই পর্যটন বন্ধ বা সীমিত থাকলে তাঁদের আয়-রোজগারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
তিনি আরও বলেন, দুই বছর পর পর্যটনকে ঘিরে দ্বীপের মানুষের মধ্যে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে স্থানীয়রা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজও চলছে।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে দ্বীপের মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। কারণ, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ বাসিন্দাই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুমে তাঁদের কর্মব্যস্ততা ও আয়-রোজগার দুটোই বাড়ে।
তিনি জানান, দ্বীপবাসী যেন পুরোপুরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au