বাংলাদেশ

২০শে জুন: যেদিন সিলমোহর পড়েছিল বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তে

  • 5:17 am - June 21, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৯৭ বার
ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত যেদিন কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু (বাঁয়ে) ও মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে (ডানে) জানালেন ভাইররয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন (মাঝে)

২০শে জুন, বাঙালির ইতিহাসে ও বাংলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে দুটি কারণে।

এই দিনেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলা ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে দখল করেছিলেন কলকাতা।

সেটা ছিল ১৭৫৬ সাল। সেই ইতিহাস বহুল গ্রন্থিত ও চর্চিত।

তবে তার প্রায় দুশো বছর পরে, আজকের দিনেই, ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার আইনসভা এক ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে এক অংশ যাবে ভারতে, অন্য অংশটি যাবে পাকিস্তানে।

সেই ভোটাভুটি নিয়ে তুলনামূলক ভাবে কম আলোচনা হয়।

সেদিনের ভোটাভুটিতে পাকিস্তানের দিকে চলে গিয়েছিল বাংলার যে অংশটি, একসময়ের সেই পূর্ব বঙ্গ, দেশভাগের পরে যা ছিল পূর্ব পাকিস্তান, সেটাই আজকের বাংলাদেশ।

অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় ২০শে জুন, ১৯৪৭ সালের সেই ঐতিহাসিক ভোটাভুটির তথ্য বলছে, সেদিন তৎকালীন পূর্ব বঙ্গ, এখনকার বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান আইনসভার সদস্য বাংলা ভাগ করার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তারা চাননি যে বাংলা ভাগ হোক।

অন্যদিকে আইনসভার হিন্দু সদস্যরা বেশিরভাগই ভোট দিয়েছিলেন বাংলা ভাগ করার পক্ষে।

বাংলা ভাগ আটকানোর প্রচেষ্টা

ভারতের স্বাধীনতার বেশ কয়েক মাস আগে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমদের মতো বেশ কয়েকজন মুসলিম নেতা এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর দাদা শরৎ চন্দ্র বসু ও কিরণ শঙ্কর রায়ের মতো কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা বাংলাকে ভাগ না করে একটি যুক্ত বঙ্গ প্রদেশের পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনাকে ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল প্ল্যান’ বলা হয়।

ওই পরিকল্পনা একটা সময়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরও সমর্থন পেয়েছিল।

যুক্ত বঙ্গ প্রস্তাব নিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে আলোচনায় শরৎচন্দ্র বসু (ডানে), কলকাতা লাগোয়া সোদপুরের খাদি আশ্রমের মাঠে

কলকাতা লাগোয়া সোদপুরের খাদি আশ্রমে বেশ কয়েক দফায় মি. গান্ধী এসে যুক্ত বঙ্গ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

পরিকল্পনাটির ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এবং কংগ্রেস হাইকমাণ্ডের জওহরলাল নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেল।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর যুক্তি ছিল, যদি বাংলাকে ভাগ না করা হয় এবং যদি ‘যুক্ত-বঙ্গ’ নামে একটি তৃতীয় সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়, তাহলে সেই যুক্ত-বঙ্গ একসময়ে পাকিস্তানে চলে যাবে।

লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ঘোষণা

যুক্ত বঙ্গ পরিকল্পনাকে ব্রিটিশ সরকার যে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের একটি সিদ্ধান্তে।

ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা যখন প্রায় চূড়ান্ত, সেই সময়েই ১৯৪৭ সালে তিনি লন্ডনে গিয়ে ভারত ভাগের ঘোষণা রেডিওতে সম্প্রচারের জন্য রেকর্ড করে আসেন।

ঐতিহাসিক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গার্ডিনার অধ্যাপক সুগত বসু বিবিসিকে বলেছিলেন, “মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার মাধ্যমে তেসরা জুনই ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল যে পাঞ্জাব আর বাংলা ভাগ করা হবে।”

অধ্যাপক সুগত বসুর কথায়, “লর্ড মাউন্টব্যাটেন তেসরা জুন, ১৯৪৭, যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেন রেডিওতে, তার দুটো ভার্সন লন্ডনে গিয়ে রেকর্ড করে এসেছিলেন।

চৌঠা অগাস্ট, ১৯৪৭, ক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে তখন

‘ব্রডকাস্ট এ’ – তে ছিল পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করে ভারতের স্বাধীনতা দেওয়ার ঘোষণা আর ‘ব্রডকাস্ট বি’-তে ছিল যে বাংলার হিন্দু এবং মুসলমান নেতারা একটা রফা করেছেন এবং তারা অবিভক্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,” বলছিলেন অধ্যাপক সুগত বসু।

সেক্ষেত্রে ভারত ভাগ হয়ে তিনটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা ছিল যুক্ত বঙ্গ পরিকল্পনায়: একটি ভারত, অন্যটি পাকিস্তান এবং তৃতীয়টি যুক্ত বঙ্গ প্রদেশ।

অধ্যাপক বসুর কথায়, “লন্ডন থেকে ফিরে আসার পরে কংগ্রেস হাই-কমান্ড, অর্থাৎ জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল যুক্ত-বঙ্গ পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিলেন। সেখানেই শেষ হয়ে যায় ওই পরিকল্পনা।”

এরপরেই শুরু হয় বাংলা ভাগ করার জন্য ভোটাভুটির প্রক্রিয়া।

বাংলা ভাগের জন্য ভোট প্রক্রিয়া

বাংলাদেশের লেখক মুহাম্মদ আসাদ তার ‘বাংলা যেভাবে ভাগ হলো’ বইতে লিখছেন, “অবিভক্ত বাংলার গভর্নর ১৯৪৭ সালের ১১ জুন এক ঘোষণা দিয়ে বাংলা বিভাগ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২০শে জুন প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করেন।”

ওই বইতে যে বানান লেখা হয়েছিল, তা অপরিবর্তিত রাখা হলো।

মুহাম্মদ আসাদ লিখেছেন, “অতপর ২০ জুন বাংলাকে ভাগ করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় তেসরা জুনের পরিকল্পনা মোতাবেক। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগ দলীয় ব্যবস্থাপক সদস্যদের নিকট এই মর্মে নির্দেশ প্রেরণ করেন যে, তারা যেন পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাংলা বিভাগের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে ভোট প্রদান করেন। কংগ্রেস হাই কমান্ডও বাংলার সকল হিন্দু পরিষদ সদস্যদের নিকট এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন বাংলা বিভাগের পক্ষে ভোট দান করেন।”

“ব্রিটিশ সরকারের তেসরা জুনের ঘোষণার ভিত্তিতে ২০ জুন বঙ্গীয় আইন পরিষদের বিধায়কদের এক যুক্ত অধিবেশন বিকেল ৩টায় স্পিকার নূরুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে দুটি গণপরিষদ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিধায়কদের মধ্যে ভোটাভুটি হয়। পরিষদের ১২৬ জন সদস্য প্রস্তাবিত পাকিস্তান গণপরিষদে যোগদানের পক্ষে ভোট দেন। ১২৬ জনের মধ্যে ১২০ জন মুসলিম লীগ সদস্য, পাঁচ জন ছিলেন তফসিলী ফেডারেশনের সদস্য এবং একজন ছিলেন ভারতীয় খ্রীস্টান,” লিখেছেন মুহাম্মদ আসাদ।

তিনি আরও লিখেছেন, “অপরদিকে ৯০ জন সদস্য ভারতীয় গণপরিষদে যোগদানের পক্ষে ভোট দেন। ওই ৯০ জনের মধ্যে ৮২ জন ছিলেন কংগ্রেস সদস্য, চার জন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, এক জন ভারতীয় খ্রীস্টান, শ্যমাপ্রসাদ মুখার্জী, বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মাহতাব।”

এরপরের অংশে ভোটাভুটি হয় বাংলা ভাগ হবে কি না, সেই প্রশ্নে।

মুসলমান সংখ্যাগুরু পূর্ব বঙ্গ অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের ভোটে বাংলা ভাগ করার বিপক্ষে রায় যায়। ১০৬টি ভোট বাংলা ভাগের বিপক্ষে আর মাত্র ৩৫টি ভোট পড়েছিল বাংলা ভাগ করার পক্ষে।

আর হিন্দু সংখ্যাগুরু পশ্চিমবাংলা অংশের জনপ্রতিনিধিদের ভোটে ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগ করার পক্ষে রায় যায়।

সেদিন সোহরাওয়ার্দী যা বলেছিলেন

প্রাদেশিক আইনসভা বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেওয়ার পরে সেদিনই বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী গবেষক আলিমুজ্জামান জানাচ্ছেন, “সেই বিবৃতিতে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলেছিলেন যে আশা-নিরাশার যন্ত্রণার ইতি হলো অবশেষে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্রের আদর্শের পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। বাংলাকে দ্বিধাবিভক্ত করা হবে অচিরেই, মুসলিম বাংলার ক্ষোভের বিশেষ কারণ নেই।”

“ওই বিবৃতিতেই সোহরাওয়ার্দী সাহেব আরও বলেছিলেন যে আমাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। চলুন আমরা পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বের ভাব বজায় রেখেই পৃথক পথে এগিয়ে যাই,” বলেন মি. আলিমুজ্জামান।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

তার কথায়, “হিন্দুরা যে বাংলা ভাগের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন, তার একটা বড় কারণ এক বছর আগে ঘটে যাওয়া ৪৬-এর দাঙ্গা, যা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

ওই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়া এবং সময়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার জন্য অনেকেই দায়ী করে থাকেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে।

কিন্তু তিনিই কি শুধু দায়ী? সত্যিই কি তার দোষেই প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল?”

এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ আছে।

তবে আলিমুজ্জামান বলছিলেন, “কী অদ্ভুত সমাপতন দেখুন। ১৭৫৬ সালের যে দিনে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলা কলকাতা দখল করলেন, তার ঠিক ১৯১ বছর পরে সেই তারিখেই, সেই কলকাতা শহরে বসেই বাংলা ভাগ করার সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ল।”

—অমিতাভ ভট্টশালীর প্রতিবেদন
বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

এই শাখার আরও খবর

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

ধামরাইয়ের ৫২০ কেজির অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা, হবে না বিসর্জন

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ৫২০ কেজি ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার পূজা চলছে। আগামীকাল বুধবার পূজা শেষে এটি দেওয়া হবে না বিসর্জন। এটিই এখানকার রীতি।…

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au