জি এম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার, মুজিবুল হক ও শামীম হায়দার পাটোয়ারী। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা, ৮ জুলাই-
জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় সম্মেলন সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরে তীব্র মতবিরোধ ও সংঘাতের মধ্যে ‘ছাঁটাই রাজনীতি’ শুরু করেছেন দলীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সোমবার তিনি তিন শীর্ষ নেতাকে—জ্যেষ্ঠ কো–চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো–চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে—প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে অব্যাহতি দেন। একইসঙ্গে নতুন মহাসচিব হিসেবে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে নিয়োগ দেন। এর মাধ্যমে এক সপ্তাহে ১১ জন নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো, যা নিয়ে দলের ভেতরে সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অব্যাহতিপ্রাপ্ত তিন নেতা বলেছেন, চেয়ারম্যান গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারার অপব্যবহার করে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং এর বিরুদ্ধে তাঁরা আইনি লড়াইয়ে যাবেন। তাঁদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রবিরোধী ও এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোভাবের প্রকাশ। তাঁরা মনে করেন, জাতীয় পার্টিতে যৌথ নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র চর্চার পরিবর্তে একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে জি এম কাদের ও তাঁর সমর্থকরা দাবি করছেন, এই নেতারা বারবার ব্যক্তিস্বার্থে দলকে ব্যবহার করেছেন এবং এবারও একই চেষ্টা করছেন বলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দলের প্রেসিডিয়াম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাঁদের এক বছরের বেশি চাঁদা বাকি আছে, তাঁদের পদ বাতিল করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে চেয়ারম্যানের আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণেই এই ছাঁটাই সিদ্ধান্ত এসেছে বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো দাবি করছে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সম্মেলনের আগে মহাসচিব ও অন্যান্য শীর্ষ পদের প্রার্থী হিসেবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা একযোগে গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারা সংশোধন করে দলকে গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তবে জি এম কাদের ও তাঁর শিবির এই দাবিকে নিজেদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে।
এ নিয়ে উভয় পক্ষই সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়েছে। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করবেন অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতারা, আর পরদিন জি এম কাদেরপন্থিরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন।
জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের ইতিহাসে এমন উন্মুক্ত সংঘাত বিরল, যা এখন প্রকাশ্য বিরোধ ও নেতৃত্বের টানাপোড়েনের রূপ নিয়েছে। এ ঘটনায় দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
জাতীয় পার্টি (জাপা) বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, যা ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরশাদের শাসনামলে দলটি ক্ষমতায় ছিল এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর দলটি বিরোধী দলে চলে যায় এবং পরে নানা সময়ে বিভিন্ন জোটের অংশ হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকে। এক সময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং আবার কখনো বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতায় যায়।
দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং বারবার বিভক্তি ও পুনর্মিলনের ইতিহাস রয়েছে জাপার। এরশাদের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জিএম কাদেরের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়, যা এখনো দলকে প্রভাবিত করছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে জাপা কখনো সরকারে, কখনো বিরোধী দলে থেকেও দেশের রাজনীতিতে একটি আলোচিত এবং সমালোচিত শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দলটি এখনও নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টায় নানা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও সমন্বয়ের পথে হাঁটছে।
সুত্রঃ প্রথম আলো