পশ্চিম তীরের খিরবেত জানুতা গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলছে ইসরায়েলি পুলিশ; ছবিঃ আল জাজিরা
মেলবোর্ন, ১৩ জুলাই-
পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় নতুন করে উচ্ছেদের মুখে পড়েছেন অন্তত এক হাজার দুইশ’ ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই এলাকাকে ‘ফায়ারিং জোন ৯১৮’ হিসেবে ঘোষণা করে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্ছেদের পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি হাইকোর্টে দেওয়া এক চিঠিতে সেনাবাহিনী জানায়, তারা গ্রামের ঘরবাড়ি, স্কুলসহ নানা স্থাপনা ধ্বংসের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ এই পদক্ষেপকে পরিকল্পিত জাতিগত স্থানচ্যুতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। মাসাফের ইয়াত্তা’র স্থানীয় পরিষদের চেয়ারম্যান নিদাল ইউনিস বলেন, “এটা আমাদের জীবনের লড়াই। আমাদের বাড়ি ভেঙে দিলে আমরা কোথায় যাব?” তিনি জানান, ২০০০ সাল থেকে এই উচ্ছেদের প্রচেষ্টা চলে আসছে, কিন্তু সম্প্রতি তা দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও প্রশাসন যুক্তি দেখাচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এই এলাকা দরকার। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এটি শুধু বসতি সম্প্রসারণ ও দখলকেই ত্বরান্বিত করবে। ২০২২ সালে ইসরায়েলি হাইকোর্ট এই উচ্ছেদকে বৈধতা দেওয়ার পর থেকেই ভয়াবহ শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে পশ্চিম তীরের অন্য অংশেও দখল ও উচ্ছেদের ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে টুলকারেম ও জেনিনে চলমান ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’-এর কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বুলডোজার ও ট্যাংকের আঘাতে বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, গাজা যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীরেও একই ধরনের দমন নীতি বাস্তবায়ন করছে ইসরায়েল।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (UNRWA) সতর্ক করেছে, এত মানুষকে দ্রুত উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুত করা মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিম তীরের চেহারা পুরোপুরি বদলে যাবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে ফিলিস্তিনিদের জীবনে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ।
মাসাফের ইয়াত্তার মানুষরা এখনো আদালতের দ্বারস্থ হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও চাপ আশা করছেন, যাতে অন্তত তাদের বাকি গ্রামগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। তবে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে এই এলাকার বহু মানুষের জীবন খুব শিগগিরই চরম অনিশ্চয়তায় পড়তে চলেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা ও মানবাধিকার কর্মীরা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অভূতপূর্ব হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। ওইদিন দক্ষিণ ইসরাইলের বিভিন্ন গ্রামে রকেট ও স্থল হামলা চালিয়ে হামাস প্রায় এক হাজারের বেশি মানুষ হত্যা ও শত শত ইসরাইলিকে জিম্মি করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল গাজার ওপর ব্যাপক বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান শুরু করে, যা পরে স্থল অভিযানেও রূপ নেয়।
ইসরাইল বলছে, হামাসের সামরিক ক্ষমতা ধ্বংস এবং জিম্মিদের মুক্তিই তাদের মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে হামাস দাবি করছে, বছরের পর বছর ধরে গাজা অবরোধ ও ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর নিপীড়নের জবাব দিতেই তারা এই হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও বিপুল সংখ্যক মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। মানবিক সংকট চরমে পৌঁছেছে। যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীর ও লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
মূলত হামাসের আকস্মিক হামলা, ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতেরই ধারাবাহিকতায় এই যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে; যার প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই পড়ছে।