এই হিসাবের বাইরেও আরও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা সমাজকে আরও শঙ্কিত করছে। ছবিঃ প্রতিকী
ঢাকা, ১৩ জুলাই-
ঢাকা শহরসহ সারাদেশে হত্যাকাণ্ড ও হিংস্রতার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা স্বাভাবিক বোধবুদ্ধিরও বাইরে। একের পর এক তুচ্ছ কারণ বা পুরনো বিরোধের জেরে ঘটে চলেছে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড, খুনের পর প্রকাশ্যে উল্লাস, এমনকি মরদেহের সঙ্গেও বিকৃত আচরণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নয়, সমাজের গভীরতর মূল্যবোধেরও বিপর্যয়ের প্রতিফলন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজধানীতেই খুন হয়েছেন ১২১ জন। আর জুলাইয়ের প্রথম ১২ দিনে আরও অন্তত ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ফলে বছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসেই রাজধানীতে মোট ১২৭ জন মানুষ খুন হয়েছেন।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, একই সময়ে সারা দেশে রাজনৈতিক কারণে ৬৫ জন, মব ভায়োলেন্সে ৮৯ জন এবং বিভিন্ন কারণে ২২০ শিশু খুন হয়েছে। এই হিসাবের বাইরেও আরও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা সমাজকে আরও শঙ্কিত করছে।
পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী ও যুবদলকর্মী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে বর্বর কায়দায় হত্যার ঘটনায় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। শুধু সোহাগ হত্যাই নয়—চট্টগ্রামে ফাতেমা বেগমকে ১১ টুকরা করা, খুলনায় যুবদলের সাবেক নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা, চাঁদপুরে ইমামকে খুতবা পছন্দ না হওয়ায় হত্যাচেষ্টা, গাজীপুরে চুরির অপবাদে কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা—এসব ঘটনাও চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৈথিল্য ও অপরাধীদের মধ্যে ‘কিছুই হবে না’ মানসিকতা থেকেই এ ধরনের নৃশংসতা বাড়ছে। তার মতে, দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এই প্রবণতা ঠেকাতে পারে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক মনে করেন, বিকৃত মানসিকতার এক শ্রেণির মানুষ আইনশৃঙ্খলার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে এ ধরনের অপরাধ করে। তিনি বলেন, পরিবারের শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও রাষ্ট্রের কঠোর ভূমিকার সমন্বয়েই এসব বন্ধ করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বিচারহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনের শাসনের দুর্বলতাই মূলত এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। তার মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পদক্ষেপ নয়—একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও জরুরি।
সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “এ ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য নয়, পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।” তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রতিদিনের মতো কেন এমন নৃশংস ঘটনা ঘটছে? আর কতদিন এমনভাবে আতঙ্কে দিন কাটাতে হবে?
বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের (২০১২) মতো ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলন হলেও বছরের পর বছর এমন অনেক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোষীদের দ্রুত শাস্তি, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং সামাজিক-পারিবারিক শিক্ষা জোরদার না করলে এই বৃত্ত থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
তথ্যসূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ডিএমপি, বিশেষজ্ঞ মতামত ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন