পুলিশের গুলিতে নিহত ইসরাইলি সেনা
ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর নেতানিয়ায় পুলিশের গুলিতে এক ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) শহরের কিরিয়াত হাশারোন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে…
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুন ধরনের কূটনৈতিক কৌশল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপকে ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশকে কোনো একটি দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে চীন সফর বিশেষ গুরুত্ব পায়। গত জুনে বেইজিং সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিমান ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি কেনার বিষয়েও চুক্তি হয়েছে।
এ কারণে শুধু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ায় বাংলাদেশকে চীনঘেঁষা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির কারণে মার্কিনঘেঁষা হিসেবে দেখাকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের উচিত প্রতিটি দেশের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবশ্য তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন তৈরি হয়। বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা ছিল। পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উড়োজাহাজ ও জ্বালানি কিনতে পারে। একইভাবে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে দেশটির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিকে বাস্তবে কার্যকর করতে শুধু নীতির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। দক্ষ কূটনীতিক, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক জোট ও অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন দেশের স্বার্থ বোঝার সক্ষমতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বিশাল বাজার, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান বাংলাদেশের বড় সম্পদ। ভারতের বাণিজ্য ও যোগাযোগ, চীনের অবকাঠামো ও আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কূটনীতিতে শুধু বাংলাদেশ কী চায়, সেটি তুলে ধরলেই হবে না। অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কীভাবে লাভবান হতে পারে, সেটিও তুলে ধরতে হবে। এতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের গুরুত্ব আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ের কূটনীতির পাশাপাশি ‘ট্র্যাক ১.৫’ ও ‘ট্র্যাক ২’ কূটনীতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ট্র্যাক ১.৫ এবং শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাবেক কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ট্র্যাক ২ কূটনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগও বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯৯ সালে বিশেষজ্ঞদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডি নেতৃত্বাধীন কুনমিং ইনিশিয়েটিভ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংলাপে ভূমিকা রেখে আসছে।
তবে এসব উদ্যোগকে এখনো একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ট্র্যাক ২ কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি। অনেক উদ্যোগ নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সময়ের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। আলোচনায় উঠে আসা বিভিন্ন সুপারিশও সব সময় দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণে যুক্ত হয় না। তাই ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরকারি কূটনীতির সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংলাপকে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতের রাইসিনা ডায়ালগ, সিঙ্গাপুরের শাংগ্রি-লা ডায়ালগ, জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন এবং কাতারের দোহা ফোরাম এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বাংলাদেশও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক সংলাপের মাধ্যমে এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পারে। ২০২২ সাল থেকে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ, সিজিএস আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ বিভিন্ন দেশের সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসছে।
আগামী ৫ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠেয় পঞ্চম ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এ শতাধিক দেশের প্রতিনিধির অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তাদের মতে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি থিংকট্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী সংগঠন, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে কাজে লাগাতে হবে। বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেই সেটিকে ভিন্ন কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এসব আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনো একটি শক্তির বলয়ে না গিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সরকারি কূটনীতির পাশাপাশি বিকল্প ও সহায়ক কূটনৈতিক কাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ট্র্যাক ২ কূটনীতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিকল্প নয়, বরং সরকারি কূটনীতিকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au