কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলটির শীর্ষ নেতারা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ জুলাই-
ভারতের বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ‘বাংলাদেশি’ তকমা লাগিয়ে বাংলাভাষী নাগরিকদের হয়রানির প্রতিবাদে বুধবার (১৬ জুলাই) কলকাতার রাজপথে সরব হন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলেজ স্কয়ার থেকে শুরু হয়ে ধর্মতলার ডরিনা ক্রসিং পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলটির শীর্ষ নেতারা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক।
প্রতিবাদ সভায় মমতা বলেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এখন বাংলায় কথা বললেই গ্রেফতার, উচ্ছেদ কিংবা আটককেন্দ্রে প্রেরণের শিকার হচ্ছেন অনেক বাঙালি। দিল্লি, আসাম, ওডিশা, রাজস্থান, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে এভাবে বাঙালিদের টার্গেট করে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, “বাঙালিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে বিজেপি বাংলাদেশি তকমার আশ্রয় নিচ্ছে।”
মমতা আরও বলেন, “কোচবিহার, নদিয়ার মতো সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ যেভাবে ‘পুশব্যাক’ করছে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। বিএসএফ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে, অনুপ্রবেশ যদি হয়েই থাকে, তাহলে দায় তো কেন্দ্রীয় সরকারের।” তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই আবার খেলা হবে। বিজেপি তৈরি থাকো।”
বাম ও কংগ্রেসের সমালোচনা করে মমতা বলেন, “আজ বাম-রাম এক হয়েছে। জগাই-মাধাই-গদাই একজোট হয়েছে। এদের প্রতিহত করতেই আজকের আন্দোলন।” পাশাপাশি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতি বিজেপির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি, “ভোটের সময় মতুয়াদের দরকার পড়ে, ভোট শেষ হলে তাদের ওপর চলে নির্যাতন।”
বিজেপির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় দলটির নেতা শুভেন্দু অধিকারী মমতাকে কটাক্ষ করে বলেন, “এতই যদি বাঙালি দরদ, তাহলে লোকসভায় অবাঙালি কীর্তি আজাদ বা ইউসুফ পাঠানকে কেন প্রার্থী করলেন?” তিনি অভিযোগ করেন, “মমতা রাজ্যে রোহিঙ্গা ও মুসলিম অনুপ্রবেশকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাভাষীদের হেনস্তার গল্প বানাচ্ছেন—সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য এটা তৃণমূলের একটি রাজনৈতিক কৌশল।”
বিজেপির আরেক নেতা সুকান্ত মজুমদার অভিযোগ করেন, “মমতা যখনই রাজনৈতিক চাপে থাকেন, তখনই বাঙালি বাঙালি মন্ত্র জপ করেন। আসলে ভোটে জেতার জন্যই তিনি অনুপ্রবেশকারীদের ভারতের নাগরিক বানানোর পাঁয়তারা করছেন।”
বিক্ষোভ সমাবেশের প্রেক্ষাপটে জানা গেছে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সম্প্রতি বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ এবং আটক করার ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে আসামে এর মাত্রা অনেক বেশি, যেখানে রাজ্য সরকার এনআরসি ও নাগরিকত্ব নিয়ে আগেই বিতর্কে রয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিশ্বাস, বাংলাভাষীদের ওপর চলমান এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব হয়ে দলটি আসন্ন রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্যেই ২১ জুলাই শহীদ দিবসের সমাবেশকে ঘিরে নতুন বার্তা দিতে চাইছেন মমতা। অন্যদিকে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১৮ জুলাইয়ের দুর্গাপুর সফরকে সামনে রেখে পাল্টা প্রচারে মাঠে রয়েছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে কংগ্রেস, সিপিএম ও সিপিআই(এমএল)–এর মতো বিরোধী দলগুলিও বাংলাভাষীদের হেনস্তার প্রতিবাদে বিভিন্ন মিছিলে যোগ দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল এই ইস্যুতে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে—যেটা আগামী ভোটের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।