আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। ছবিঃ আল জাজিরা
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই-
ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে তার দেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে না এবং এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হবে।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। এটি ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাঁর প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। তবে পেজেশকিয়ানের মতে, এসব হামলায় ইরানের প্রকৃত ক্ষতি তেমন কিছুই হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরা ইসরায়েলের যেকোনো নতুন সামরিক অভিযানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী আবারও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে গভীরভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।”
যদিও গত ২৪ জুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা এই যুদ্ধবিরতির ওপর খুব একটা ভরসা করছি না। তাই আমরা সব সম্ভাবনার জন্যই প্রস্তুত। ইসরায়েল আমাদের ক্ষতি করেছে, আমরাও তাদের কড়া জবাব দিয়েছি। ইসরায়েল তার ক্ষয়ক্ষতি গোপন করছে।”
তিনি আরও জানান, ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অনেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানী নিহত হন এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কিছু ক্ষতি হয়। কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব কাঠামোকে ধ্বংস করার ইসরায়েলের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।
এই ১২ দিনের সংঘাতে ইরানে ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন।
পারমাণবিক কর্মসূচি চলবে
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করবে না। “আমাদের পারমাণবিক সক্ষমতা কোনো ভবনে নেই, এটা আমাদের বিজ্ঞানীদের মাথায়। আমরা এই কর্মসূচি চালিয়ে যাব আন্তর্জাতিক আইন মেনে।”
তিনি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না—এটা আমরাও মানি। কারণ আমরা পারমাণবিক অস্ত্রে বিশ্বাস করি না। এটা আমাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, মানবিক ও কৌশলগত অবস্থান। তবে আমরা হুমকি বা চাপ মানি না। যেকোনো আলোচনাই হতে হবে দু’পক্ষের জন্য লাভজনকভাবে।”
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি—যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শেষ হয়ে গেছে—তাকে ‘ভ্রান্ত কল্পনা’ বলে মন্তব্য করেন।
নিজের ওপর হামলার অভিযোগ
পেজেশকিয়ান বলেন, গত ১৫ জুন তেহরানে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইসরায়েল তাঁর ওপর হত্যা চেষ্টার চেষ্টা করে, এতে তিনি সামান্য আহত হন। তিনি বলেন, এটি ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে দেশকে অস্থির করে তোলার ইসরায়েলের পরিকল্পনার অংশ। তবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।
কাতার নয়, লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর পর, ইরান কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা কাতারকে নয়, ওই ঘাঁটি থেকে আমাদের দেশে হামলা চালানো হয়েছিল বলে সেটিই লক্ষ্য করেছি। কাতার ও তার জনগণের প্রতি আমাদের কোনো শত্রুতা নেই।”
তিনি বলেন, কাতারের আমিরকে ফোন করে তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ
ইরানের পারমাণবিক সংস্থার উপপ্রধান আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, সম্প্রতি হওয়া হামলায় ইউরেনিয়ামের ক্ষতির মাত্রা পর্যালোচনা করছে তারা এবং শিগগিরই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (IAEA) রিপোর্ট দেবে।
পেজেশকিয়ান সম্প্রতি একটি আইন পাস করে IAEA-এর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করলেও এখন আবার ওই সহযোগিতার বিষয়ে নতুন করে বিবেচনার কথা জানিয়েছেন।
আলোচনা শুরু হচ্ছে তুরস্কে
ইতোমধ্যে ইরান, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে আলোচনার জন্য এক বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। এটি অনুষ্ঠিত হবে তুরস্কে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (Joint Comprehensive Plan of Action) বিষয়ে ইরানকে আবার আলোচনায় ফিরতে আহ্বান জানাচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো। তারা সতর্ক করেছে, ইরান যদি আলোচনায় না ফেরে, তাহলে তার ওপর পুনরায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
সুত্রঃ আল জাজিরা