এই রায়কে পরিবেশনীতিতে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই-
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে- এমন এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। বুধবার নেদারল্যান্ডসের হেগে আদালত এই রায় দেন, যা বৈশ্বিক পরিবেশনীতিতে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইসিজের রায়ে বলা হয়েছে, অতীতে কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে জলবায়ু সংকটের দায়বদ্ধতা বিচারযোগ্য হলেও, কোন দেশ কতটা দায়ী তা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে। যদিও এই রায় বাধ্যতামূলক নয়, তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলবে। জলবায়ু হুমকির মুখে থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য এই রায়কে বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা বহুদিন ধরে কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় ছিল।
এই নজিরবিহীন আইনি উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল ২০১৯ সালে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর কিছু তরুণ আইন শিক্ষার্থীর হাত ধরে। রায়ের পর ভানুয়াতুর বাসিন্দা ফ্লোরা ভানো বলেন, “আজ রাতে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব। আমাদের যন্ত্রণা, লড়াই ও ভবিষ্যতের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে আইসিজে।”
আইনজীবীদের মতে, এই রায়ের বাস্তব প্রয়োগ শিগগিরই শুরু হতে পারে। পরিবেশবাদী ও জলবায়ু আইনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশ অতীতে ব্যাপক জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতায় বড় ভূমিকা রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবি করার পথ এখন অনেকটাই সুগম হলো।
শুনানিতে যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু উন্নত দেশ এই মামলার বিরোধিতা করেছিল। তারা যুক্তি দিয়েছিল, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিসহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তিই যথেষ্ট। তবে আদালত তাদের যুক্তি নাকচ করে দেন।
বিচারপতি ইওয়াসাওয়া ইউজি বলেন, “যদি কোনো দেশ জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা না করে, তবে তা প্যারিস চুক্তির লঙ্ঘন। এমনকি যারা প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বা ভবিষ্যতে তা থেকে বেরিয়ে যেতে চায়, তারাও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পরিবেশ রক্ষায় বাধ্য।”
রায়ে আরও বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। এতে ভবন, অবকাঠামো ধ্বংস বা চরম আবহাওয়ার প্রভাব অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এমনকি কোনো অঞ্চল পুনরুদ্ধারযোগ্য না হলে, সরকার ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, ক্ষতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী কি না—তা প্রতিটি ঘটনায় প্রমাণ করতে হবে। যদিও ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ এখনও সম্ভব নয়, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার—যার অর্থ প্রতি ঘণ্টায় ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ল’-এর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জোয়ি চৌধুরী বলেন, “আজকের রায় একটি যুগান্তকারী আইনগত মুহূর্ত। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জলবায়ু বিপর্যয়ের শিকারদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।”
সুত্রঃ বিবিসি