আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালি মুসলমান এবং হিন্দু শ্রমজীবী মানুষ। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই-
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা পাথর আলি শেখ প্রতিদিনের মতোই হরিয়ানার গুরুগ্রামে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাগজ, বোতল ও অন্যান্য পুরোনো জিনিস কুড়াচ্ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে ভাঙারির কাজ করেন। গত ১৯ জুলাই, শনিবার হঠাৎ এক পুলিশ ভ্যান তাকে ডাক দেয়। কাগজপত্র দেখতে চায়। কাজের সময় সঙ্গে কোনো কাগজ না থাকায় তাকে গাড়িতে উঠতে বলা হয়। এরপর তাকে সেক্টর ৪৩ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তার মতো আরও ১০ জনকে আটক করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে সবাইকে সেক্টর ১০এ-তে একটি কমিউনিটি হলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ছিল একটি অস্থায়ী আটক শিবির। সেখানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালি মুসলমান এবং হিন্দু শ্রমজীবী মানুষ।
আটক ৭৪, ছাড়া পেয়েছেন ২৬ জন
শিবিরে প্রায় ৭৪ জনকে একসঙ্গে রাখা হয়েছিল বলে জানান পাথর আলি। দুই বেলা তাদের ভাত-তরকারি খেতে দেওয়া হতো। তিনি বলেন, “আমি তো ভারতীয়। আমার সব কাগজপত্র যেমন আধার কার্ড, ভোটার আইডি রয়েছে। তবুও আমাকে চারদিন ধরে আটকে রাখা হলো।” নবদ্বীপ থানার ওসির মাধ্যমে পরিচয়পত্র যাচাই ও নিশ্চিত হওয়ার পর বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তিনি ছাড়া পান। একইসঙ্গে আরও ২৫ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো সেখানে অনেকে আটক রয়েছেন বলে জানান পাথর আলি শেখ।
ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ
গুরুগ্রামের শ্রমিক সংগঠক মুকুল হাসান শেখ জানান, পুলিশ বিশেষভাবে মুসলিম বাঙালিদের টার্গেট করছে। তিনি বলেন, “একই এলাকার হিন্দু হলে তার আধার কার্ড দেখেই ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু মুসলমান হলে থানায় নিয়ে গিয়ে ওই শিবিরে রাখছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, আসামের মুসলিমদের যখন এনআরসি নথি দেখানো হচ্ছে, তখন পুলিশ তা ‘জাল নথি’ বলে বাতিল করছে।
অমানবিক পরিবেশ, বেআইনি কার্যক্রম
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুপান্থ সিনহা জানান, গুরুগ্রামের সেক্টর ১০এ-তে যে অস্থায়ী শিবিরে পাথর আলি ছিলেন, সেখানে তিনি গিয়ে প্রায় ২০০ জনকে দেখেছেন। তিনি বলেন, “ওখানে যাদের রাখা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগকেই ওয়েস্ট জোন থেকে আনা হয়েছে। আরও বেশ কিছু জোনেও এমন শিবির তৈরি করা হয়েছে। সেসব স্থানে আমি না গেলেও খবর পেয়েছি।” তিনি বলেন, “তাদের তিন-চারদিন ধরে অমানবিক, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আটক রাখা হয়েছে। খাবারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না।”
তিনি জানান, পুলিশ বলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে পরিচয়পত্র যাচাই না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখা হবে। তবে কোনো লিখিত নির্দেশ দেখানো হয়নি। সুপান্থ বলেন, “এই ধরনের মৌখিক নির্দেশ সম্পূর্ণ বেআইনি ও সংবিধানবিরোধী। কাউকে এভাবে ৩০ দিন পর্যন্ত আটকে রাখার বিধান নেই।”
গুরুগ্রাম পুলিশের অবস্থান
গুরুগ্রাম পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা সন্দীপ তুরান বিবিসি বাংলাকে জানান, ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ হওয়ার পরও কাউকে আটকে রাখা হয়েছে – এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে যদি এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে থাকে, তাহলে যেন পুলিশকে জানানো হয়।
‘বাংলাদেশি’ চিহ্নিত করার নামে হয়রানি
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে রাজস্থান, গুজরাত, ছত্তিশগড়, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশায় অবৈধ বাংলাদেশি খুঁজে বের করার নামে ভাষাভিত্তিক এবং ধর্মভিত্তিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বহু গরিব শ্রমজীবী মানুষ এই অভিযানের শিকার হচ্ছেন। অনেকেরই দাবি, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক হয়েও তাদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক বা এমনকি বাংলাদেশে পুশ-আউট করা হয়েছে।
এই ধরনের শিবির বা আটক প্রক্রিয়া যে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, তা একাধিক মানবাধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সুত্রঃ বিবিসি