লিড নিউজ

সরকারি হিসাবেই চলছে কাটা-ছেঁড়া, অভ্যুত্থানের এক বছর পরও নিহতের আসল সংখ্যা নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’

  • 5:50 pm - August 06, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২২২ বার
গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ৬ আগষ্ট- বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে এক দফা দাবির আন্দোলনে রূপ নেওয়া এই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় নেয়, যার ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

এই আন্দোলনের সময় যে প্রাণহানি ঘটে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো গণ-আন্দোলনে এত রক্তপাত ও প্রাণহানির নজির পাওয়া যায় না। তবে ঠিক কত মানুষ এই অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিভিন্ন পরিসংখ্যান উঠে আসছে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি।

সরকারি হিসাবে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত গেজেট অনুসারে, এই অভ্যুত্থানে ৮৪৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নাম, পরিচয়সহ তালিকা প্রকাশ করেছে সরকার। কিন্তু জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন জানায়, নিহতের সংখ্যা প্রায় ১৪০০ জন, যাদের অধিকাংশই রাইফেল ও শটগানের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। জাতিসংঘের মতে, নিহতদের অন্তত ১২-১৩ শতাংশ শিশু। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় আরও হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন এবং ১১ হাজার ৭০০ জনকে আটক করা হয়।

সরকারি তালিকা ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনের মধ্যকার এই বিস্তর পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এমনকি সরকারের গেজেটেও অসংগতি ধরা পড়েছে। একাধিক নিহত ব্যক্তির নাম তালিকায় একাধিকবার এসেছে, অন্য কোনো ঘটনায় নিহত হলেও ভুল করে অনেকের নাম গেজেটে ঢুকে পড়েছে। আবার এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, আন্দোলনে নিহত হয়ে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া ব্যক্তিদের নাম সরকারি তালিকায় নেই।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী জানান, গেজেট প্রকাশের পর নাগরিকদের কাছ থেকে অভিযোগ এসেছে। তদন্তের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, অন্তত ১৫-১৬ জনের নাম গেজেট থেকে বাদ দিতে হতে পারে। তার ভাষায়, “এই সংখ্যাটা ৮৪৪ থেকে কমবে।”

তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ও তথ্য সংগ্রহে শৃঙ্খলার অভাব ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, “শুরুতে তালিকা তৈরিতে তৎপরতা থাকলেও এখন গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি সঠিক ও নির্ভুল তালিকা তৈরি না হলে এই ঘটনাগুলো ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।”

জাতিসংঘের রিপোর্টের সঙ্গে সরকারি গেজেটের ফারাকের অন্যতম একটি কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে, সরকারি তালিকায় শুধু আন্দোলনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে নিহত হয়েছেন। কিন্তু জাতিসংঘের হিসাবে, সেই সময় পুলিশ, আওয়ামী লীগ কর্মী এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত অন্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ২০২৪ সালের অক্টোবরে এক তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ৪৪ জন নিহত পুলিশ সদস্যের নাম রয়েছে। এই নামগুলোও সরকারি শহীদ তালিকায় নেই। কারণ সরকার শুধু আন্দোলনে নিহত সাধারণ নাগরিকদের শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার অনেক মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারালেও, তারা সরকারি বা আন্তর্জাতিক কোনো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি।

আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো, ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে জুলাই-অগাস্ট মাসে ১১৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের তথ্য। ধারণা করা হচ্ছে, এদের অনেকেই আন্দোলনে নিহত। কিন্তু যেহেতু তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়নি, তাই তাদের নামও সরকারি তালিকায় আসেনি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন এই বেওয়ারিশ মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের কাজ শুরু করেছে। তবে সচিব ইশরাত চৌধুরী জানান, “এই প্রক্রিয়ায় এখনো আমরা জানি না কতজন রয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।”
এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, এখনই নির্ভুল তালিকা তৈরি করা না হলে, ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে। অনেক ভুয়া দাবিদার ক্ষতিপূরণ কিংবা সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। একইসঙ্গে যারা সত্যিকারের শহীদ, তাদের পরিবার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

সবমিলিয়ে, অভ্যুত্থানের এক বছর পরও গণপ্রতিরোধে নিহতদের নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক তথ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক, বেওয়ারিশ দাফনের মরদেহ নিয়ে প্রশ্ন, গেজেটে ভুল নাম, কিংবা বাদ পড়াদের নিয়ে নতুন করে তদন্ত—সব মিলিয়ে এখনো একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি হয়নি, যা এই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই শাখার আরও খবর

পুলিশ লাইনসে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ, বাইরে জামায়াত নেতাকর্মীদের অবস্থান

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) মরদেহ মৃত্যুর প্রায় ১২ ঘণ্টা পরও…

রাজাকার নেতা সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যু, দাফনে বাধা

পিরোজপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।…

শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল

ঢাকার বাড্ডায় জুলাই আন্দোলনের সময় গাড়িচালক ইমদাদুল হককে হত্যার মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। একই মামলায় এজাহারভুক্ত আরও…

সিডনিতে চালু হচ্ছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ২৪ ঘণ্টা চলবে ফ্লাইট

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে দীর্ঘ আট দশকের পরিকল্পনা ও কয়েক দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর চালু হচ্ছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। রোববার (২৫ অক্টোবর) ওয়েস্টার্ন সিডনির ব্যাজেরিস ক্রিকে নবনির্মিত…

আমাকে হত্যার টার্গেটটা মিস হয়ে গেছে : আসিফ আকবর

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তাঁর গাড়িতে গুলি চালানো হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি নিজেই। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে রাজধানীর মগবাজারে তাঁর…

বৃষ্টি-ঘূর্ণিঝড়ের ধরন বদলে দিচ্ছে এল নিনো, বিশ্ব আবহাওয়ায় যে পাঁচ বড় প্রভাব

ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, প্রশান্ত মহাসাগরে বাড়ছে হারিকেনের তৎপরতা, ভারতে কমেছে মৌসুমি বৃষ্টি। ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রভাব থাকার আশঙ্কা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au