মেলবোর্ন, ১৩ আগষ্ট- যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী, স্ট্যাপলটন, একদিন তার ব্যবসা শিক্ষকের আপলোড করা ক্লাস নোট পড়ছিলেন। লিডারশিপ মডেল নিয়ে তৈরি সেই নোটের মাঝপথে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন—স্পষ্টভাবে লেখা আছে, “সব অংশ বাড়িয়ে লিখুন, আরও বিস্তারিত ও নির্দিষ্ট করুন” যা আসলে ChatGPT-কে দেওয়া একটি নির্দেশ। এরপরেই দেখা যায়, ভালো ও খারাপ নেতৃত্বের গুণাবলির তালিকা, প্রতিটির সাথে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা ও উদাহরণ, সবই বুলেট পয়েন্ট আকারে সাজানো।
এই আবিষ্কার দেখে স্ট্যাপলটন সঙ্গে সঙ্গে এক সহপাঠীকে মেসেজ করেন:
“Canvas-এ নোট দেখেছ? উনি ChatGPT দিয়ে বানিয়েছেন।”
সহপাঠী বিস্ময়ে জবাব দেয়, “ওহ মাই গড! এটা কী!”
এতেই শেষ নয়, স্ট্যাপলটন পরে ওই অধ্যাপকের স্লাইড প্রেজেন্টেশনও পরীক্ষা করেন। সেখানে আরও AI ব্যবহারের চিহ্ন মেলে: কিছু বিকৃত বাক্য, অস্বাভাবিকভাবে আঁকা মানুষের ছবি (অতিরিক্ত হাত-পা সহ), আর বেশ কিছু চোখে পড়ার মতো বানান ভুল।
স্ট্যাপলটনের ক্ষোভ ছিল দুই কারণে। প্রথমত, নর্থইস্টার্নের মতো ব্যয়বহুল ও মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি উচ্চমানের মানবিক শিক্ষা আশা করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, কোর্স সিলেবাসেই লেখা ছিল AI বা চ্যাটবট অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। অথচ শিক্ষক নিজেই সেই নিয়ম ভেঙেছেন।
তিনি দেরি না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেন এবং কোর্সের টিউশন ফিরতি দাবি করেন যা পুরো সেমিস্টারের এক-চতুর্থাংশ, প্রায় ৮,০০০ ডলারের বেশি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভূমিকায় উল্টোপাল্টা দৃশ্য
২০২২ সালের শেষ দিকে ChatGPT চালু হলে শিক্ষাজগতে প্রথমে তুমুল আলোড়ন পড়ে। কয়েক সেকেন্ডে প্রবন্ধ বা বিশ্লেষণ লিখে দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় অনেক স্কুল তা নিষিদ্ধ করে, কেউ AI শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করে।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। বরং শিক্ষার্থীরাই বলছে, শিক্ষকেরা অতিরিক্তভাবে AI-নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এমনকি Rate My Professors নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ম্যাটেরিয়াল খুঁটিয়ে দেখে ChatGPT-এর প্রিয় শব্দ যেমন “crucial” বা “delve” খুঁজে বের করছে, আর তাতেই AI ব্যবহারের প্রমাণ পাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, এটা শুধু ভণ্ডামি নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অন্যায়। তারা হাজার হাজার ডলার খরচ করছেন মানবশিক্ষকের কাছে শেখার জন্য, কোনো বিনামূল্যের অ্যালগরিদম থেকে নয়।
অন্যদিকে শিক্ষকেরা বলছেন, ChatGPT তাদের সময় বাঁচায়, কাজের চাপ কমায় এবং স্বয়ংক্রিয় সহকারী হিসেবে সাহায্য করে। Tyton Partners নামের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা শিক্ষকদের ১৮% AI নিয়মিত ব্যবহার করতেন, আর ২০২৪ সালে এই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।২২ বছর বয়সী মেরি (ছদ্মনাম) একটি অনলাইন নৃবিজ্ঞান কোর্সে তিন পাতার প্রবন্ধ জমা দেন। তিনি A গ্রেড পেয়ে খুশি হলেও মন্তব্য অংশে অদ্ভুত কিছু দেখতে পান তার অধ্যাপক সরাসরি ChatGPT-এর সাথে কথোপকথন কপি করে দিয়েছেন। সেখানে গ্রেডিং রুব্রিক এবং “খুব সুন্দর প্রতিক্রিয়া” দেওয়ার অনুরোধও ছিল।

বিতর্কিত সেই ক্লাস নোট। ছবিঃ নিউ ইয়র্ক টাইমস
মেরির সন্দেহ হয়, অধ্যাপক হয়তো তার লেখা পড়েননি। তবে জুম মিটিংয়ে অধ্যাপক জানান, তিনি পড়েছেন, কিন্তু ChatGPT-কে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিতে অনুমোদিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের AI বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকঅসলান জানান, শিক্ষকদের জন্য AI ব্যবহারে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় নিয়ম আছে, যেমন ChatGPT বা Grammarly যেন মানবিক প্রতিক্রিয়ার বিকল্প না হয়।
তবে দ্বিতীয়বার একই অভিজ্ঞতার পর মেরি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মানুষ বনাম প্রযুক্তি
ওহাইও ইউনিভার্সিটির ইংরেজি অধ্যাপক পল শোভলিন মনে করেন—একজন শিক্ষকের আসল মূল্য শিক্ষার্থীর সাথে মানবিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ায়। তিনি AI ব্যবহারের বিপক্ষে নন, তবে চান শিক্ষার্থীদের নৈতিকভাবে AI ব্যবহার শেখাতে।
তিনি উদাহরণ দেন, ২০২৩ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষা বিভাগে একটি গুলির ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের জন্য সমবেদনা বার্তা পাঠানো হয়। শেষে উল্লেখ করা হয়, বার্তাটি ChatGPT দিয়ে লেখা হয়েছে। সমালোচনার ঝড় উঠলে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন।
প্রফেসরদের ভিন্ন ভিন্ন মত
কিছু শিক্ষক ChatGPT দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ বা ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেন। কেউ মনে করেন গ্রেডিংয়ে AI ব্যবহার গ্রহণযোগ্য, আবার কেউ একেবারেই সমর্থন করেন না। কারও মতে, AI ব্যবহারে স্বচ্ছতা জরুরি; তবে অনেকে শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় তা গোপন রাখেন।
“স্টেরয়েডে ক্যালকুলেটর”
ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় অধ্যাপক শিনগিরাই ক্রিস্টোফার ক্বরাম্বা ChatGPT-কে বলেন—“স্টেরয়েডে ক্যালকুলেটর”। আগে যেখানে পাঠ পরিকল্পনায় কয়েক দিন লাগত, এখন কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়। এতে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি সময় দিতে পারেন।
হার্ভার্ডের কম্পিউটার সায়েন্স অধ্যাপক ডেভিড মালান নিজস্ব কাস্টম AI বট তৈরি করেছেন, যা শিক্ষার্থীদের কোডিং অ্যাসাইনমেন্টে দিকনির্দেশনা দেয়। তবে সরাসরি উত্তর নয়। এতে অফিস আওয়ারের চাপ কমে, আর শিক্ষার্থীদের সাথে হ্যাকাথন বা লাঞ্চে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেটি পিয়ার্স পুরনো অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে প্রশিক্ষিত AI বট বানিয়েছেন, যা তার মতো প্রতিক্রিয়া দিতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতে অনেক গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ AI করে ফেলবে—যা ভবিষ্যতের শিক্ষক তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
স্ট্যাপলটনের অভিযোগের ফলাফল
স্ট্যাপলটনের অভিযোগ নিয়ে ব্যবসায় স্কুলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। অবশেষে মে মাসে, স্নাতক সমাবর্তনের পরদিন তাকে জানানো হয় টিউশন ফিরতি দেওয়া হবে না।
তার অধ্যাপক রিক অ্যারোউড স্বীকার করেন, তিনি ChatGPT, Perplexity এবং Gamma ব্যবহার করে ক্লাস ফাইল ও ডকুমেন্ট নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন, কিন্তু ভালোভাবে যাচাই না করেই শিক্ষার্থীদের জন্য আপলোড করেছিলেন। তবে তিনি দাবি করেন—এসব উপকরণ তিনি সরাসরি ক্লাসে ব্যবহার করেননি, কারণ তার ক্লাস ছিল আলোচনা-ভিত্তিক।
এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখেছেন AI ব্যবহারে সতর্ক থাকা এবং শিক্ষার্থীদের জানিয়ে ব্যবহার করা জরুরি। বর্তমানে নর্থইস্টার্নে আনুষ্ঠানিক AI নীতি চালু হয়েছে, যেখানে উৎস উল্লেখ ও তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক।
অ্যারোউড বলেন“আমি শেখাতে ভালোবাসি। যদি আমার অভিজ্ঞতা থেকে অন্যরা শিক্ষা নিতে পারে, সেটাই আমার সাফল্য।”