দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন মোদি ও পুতিন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ আগষ্ট- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনদিনের সফরে মস্কো পৌঁছে প্রথম দিনেই তিনি রুশ ব্যবসায়ীদের ভারতীয় বাজারে আরও নিবিড়ভাবে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
মস্কোয় ‘আইআরআইজিসি-টেক’ বৈঠকে দেওয়া ভাষণে জয়শঙ্কর বলেন, গত চার বছরে ভারত–রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পাঁচগুণ বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩০০ কোটি ডলার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮০০ কোটি ডলার। তবে এর পাশাপাশি বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। ৬৬০ কোটি ডলার থেকে তা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৫৮৯০ কোটি ডলারে।
তার ভাষায়, “একটি জটিল ভূরাজনৈতিক পরিবেশে এই বৈঠক হচ্ছে। তবুও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উভয়পক্ষই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ভারতের মতো রাশিয়ার পক্ষ থেকেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত এসেছে। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেনিস মন্তুরেভের উদ্ধৃতি দিয়ে দিল্লিতে রুশ দূতাবাস জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে ভারত–রাশিয়ার বাণিজ্য ৭০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মন্তুরেভ বলেন, রাশিয়ার শীর্ষ তিন বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে এখন ভারত অন্যতম।
ইন্ডিয়া–রাশিয়া বিজনেস ফোরামে জয়শঙ্কর তুলে ধরেন, রাশিয়ার কোম্পানিগুলো ভারতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ খুঁজে পাবে। তিনি উল্লেখ করেন, ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, নগরায়ন ও ভোগের ধরণে পরিবর্তন ভারতের বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তার ভাষায়, “রাশিয়ার কোম্পানিগুলো ভারতের সংস্থাগুলোর সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হোক। সার, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ দরকার। এ জন্য আধুনিক অবকাঠামো তৈরি আছে।”
ভারত যখন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছে, তখনই মার্কিন প্রশাসনের চাপ বাড়ছে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দিল্লির ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় সমাধান না এলে শুল্ক আরও বাড়ানো হবে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “রাশিয়ার তেল কেনার জন্য আমরা ভারতের ওপর শুল্ক চাপিয়েছি। আলোচনায় সমাধান না হলে শুল্ক বাড়বেই।” ইউরোপীয় দেশগুলোকে এ বিষয়ে যুক্ত হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
ভারতের কূটনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ, এই বার্তাই ভারতের প্রতি স্পষ্ট হুমকি। অনন্তা সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ইন্দ্রাণী বাগচি মন্তব্য করেছেন, “পশ্চিমাদের কাছে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিশেষ জায়গায়। তাই ভারতকে ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’ বানানো হচ্ছে।”
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো তনভি মাদান মনে করেন, ট্রাম্প যদি ভারতকে কোণঠাসা করেন, তবে এর লাভবান হবেন পুতিন। ভারত–আমেরিকা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চাপ বাড়বে। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গেও সমঝোতার পথ খুঁজবে ভারত।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রজন কুমারের মতে, “ভারত এখন বড় এক কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে। যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া কোনো একপক্ষকেই বেছে নেওয়া ভারতের স্বার্থে নয়। তাই দিল্লি বিকল্প প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হচ্ছে, যেমন এসসিও।”
কয়েক দিন আগেই ভারতের নেতৃত্ব চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। পাশাপাশি ঘোষণা এসেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফর করবেন।
এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই মস্কোয় জয়শঙ্কর সরাসরি স্বীকার করেছেন, ভারত একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে তার মতে, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় বহুমুখী সম্পর্কই একমাত্র পথ।
সুত্রঃ বিবিসি