দেশটির বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় জনমনে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ১৯ সেপ্টেম্বর- অস্বাভাবিক তীব্র মৌসুমি বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ফিলিপিন্স। লাখো মানুষ জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এ অবস্থায় দেশটির বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় জনমনে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে।
রাস্তাঘাট নদীতে পরিণত হয়েছে, লাখো মানুষ চলাচল ও চিকিৎসাসেবায় সংকটে পড়েছেন। ছড়িয়ে পড়েছে লেপ্টোসপাইরোসিস নামের সংক্রামক রোগ। স্কুলশিক্ষিকা ক্রিসা তলেন্তিনো প্রতিদিন প্যাডেলবোটে করে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমি কর দিই, অপচয় করি না। অথচ দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা কোটি কোটি টাকা ভোগ করছেন।”
মানুষ প্রশ্ন তুলছে—বিলিয়ন বিলিয়ন পেসো ব্যয় করেও সরকার কেন বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ? সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনায় উঠেছে “ভূতুড়ে প্রকল্প”—যেখানে চুক্তি হলেও কোনো কাজই হয়নি। এমন অভিযোগ সংসদ সদস্য ও নির্মাণ খাতের প্রভাবশালীদের দিকে আঙুল তুলছে।
প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ ‘বংবং’ মার্কোস জুনিয়র নিজেও স্বীকার করেছেন যে কিছু বাঁধ ও অবকাঠামো প্রকল্প আসলে নির্মিতই হয়নি। অর্থনৈতিক পরিকল্পনা মন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ দুর্নীতিতে আত্মসাৎ হয়েছে।
এ ঘটনায় ইতিমধ্যে সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। সেনেটের একজন নেতাকেও পদচ্যুত করা হয়েছে, কারণ তাঁর নির্বাচনি প্রচারে অবৈধ অনুদান দিয়েছিলেন সরকারি প্রকল্পের একজন ঠিকাদার।
বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা আগামী ২১ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের এই দিনেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস দেশে সামরিক আইন জারি করেছিলেন। জনরোষের মুখে ১৯৮৬ সালে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে মার্কোস জুনিয়রের সাবধান হওয়া উচিত, কারণ জনরোষের বিস্ফোরণ অতীতেও শাসন ব্যবস্থার পতন ডেকে এনেছে।
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনীতিবিদ ও ঠিকাদারদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে তাদের ‘#Nepobaby’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ডিজাইনার পোশাক, দামী ব্যাগ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি শেয়ার করায় তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ চলছে।
একজন সাবেক সংসদ সদস্যের মেয়ে যখন ফেন্ডি, ডিওর পোশাক ও হারমেসের বারকিন ব্যাগে ছবি প্রকাশ করেন, তখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। অনেকেই এরপর নিজেদের অ্যাকাউন্টের মন্তব্য বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করেছেন।
‘ক্রিয়েটরস্ অ্যাগেইনস্ট করাপশন’ নামের এক গ্রুপ জানিয়েছে, তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। “আমরা ক্ষমতার সামনে আয়না ধরবো এবং ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত থামবো না,” বলেছে সংগঠনটি।
ক্ষোভ শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ নেই; ফিলিপিন্সজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান এখন রাস্তায়ও। জনসমক্ষে গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা অপদস্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি এড়াতে তাদের ইউনিফর্ম না পরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দুর্নীতি ও ‘নেপো বেবি’দের বিরুদ্ধে ফিলিপিনোদের ক্ষোভ দিন দিন তীব্র হচ্ছে, যা নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি