নজরদারি শিথিল, সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা উগ্রপন্থীদের।ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন,১ জুলাই- দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর ওপর নজরদারি আগের তুলনায় শিথিল হয়ে পড়েছে। এর সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনের কিছু সদস্য আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। বিশেষ করে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার এবং পরবর্তী কয়েকটি ঘটনার তদন্তে এমন ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানা গেছে।
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় একটি বাড়িতে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও রাসায়নিক পদার্থ উদ্ধার করে। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড, প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক এবং কালো প্লাস্টিকে মোড়ানো নয়টি তাজা বোমা। ঘটনায় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আইএস মতাদর্শে বিশ্বাসী নিষিদ্ধ সংগঠন নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে শেখ আল আমিন, অলি উল্লাহ জনি এবং শাহীন ওরফে আবু বকর অতীতেও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
তদন্তে জানা গেছে, বিস্ফোরণের আগের রাতে শেখ আল আমিন বোমা তৈরি করেছিলেন। পরে সেগুলো অন্য কক্ষে সরিয়ে রাখার পর অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তিনি, তাঁর স্ত্রী ও সন্তান আহত হন। পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে রেখে তিনি পালিয়ে যান। পরে সাভার ও রাজধানীর দোলাইরপাড়ে আত্মগোপনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে কেরানীগঞ্জের ঘটনার সঙ্গে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে পুলিশের ওপর হামলা, সায়েদাবাদে বিস্ফোরণ এবং কুমিল্লার একটি শিবমন্দিরে বিস্ফোরণের ঘটনার মিল পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফ নামে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, এই তিনটি ঘটনাতেই তাঁদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কিংবা জামিনে মুক্ত হওয়া কিছু উগ্রবাদী সদস্য আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাঁদের একটি অংশ নতুন করে বিস্ফোরক সংগ্রহ ও সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে বলেও তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বর্তমানে উগ্রবাদবিরোধী নজরদারি আগের মতো সক্রিয় নয়। পুলিশের বিশেষায়িত দুই ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন উগ্রবাদীদের অনলাইন কার্যক্রম, চলাচল, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের গতিবিধি কিংবা বিদেশি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে। ফলে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো কতটা সক্রিয় হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট গোয়েন্দা চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে কেরানীগঞ্জ থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ বোমা ও বিস্ফোরক কী উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। যদিও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রকাশ করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা আরও জানান, সাম্প্রতিক কিছু সংবেদনশীল মামলার অভিজ্ঞতার কারণে অনেক কর্মকর্তা উগ্রবাদবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এ ধরনের কার্যক্রমে আগের মতো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলেও তাঁদের পর্যবেক্ষণ।
যদিও পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজ-এর সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির বলেন, সহিংস উগ্রবাদ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি। তাঁর মতে, বাংলাদেশে পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও উগ্রবাদী তৎপরতার ঝুঁকিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি উগ্রবাদ দমনে বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।