গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও ইসরায়েলকে বয়কটের দাবিতে স্পেনে একটি বিক্ষোভের চিত্র। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন , ২৩ সেপ্টেম্বর- গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা যখন চরমে, ঠিক তখনই কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গতকাল রোববার ঘোষিত এ সিদ্ধান্তকে অনেকে দেখছেন প্রতীকী প্রতিক্রিয়া হিসেবে—যেখানে একদিকে মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে ন্যূনতম অবস্থান নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে পশ্চিমা নেতাদের জন্য এটি ‘মুখ রক্ষার কূটনীতি’।
ফ্রান্সও শিগগির ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে পারে। একই পথে আরও কিছু দেশ এগোচ্ছে বলেও কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
ইসরায়েল এই স্বীকৃতিকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র একে বলেছেন, এটি “হাস্যকর” এবং “সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করবে।”
গত ১৫ সেপ্টেম্বর অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “ফিলিস্তিন নামে কোনো রাষ্ট্র হবে না।”
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবু রাস আল–জাজিরাকে বলেন:
“যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা সাধারণত সমঝোতাপূর্ণ শান্তি চুক্তির পরই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভেবেছিল। এবার তারা প্রচলিত ধারা ভেঙে আগেভাগেই ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েল আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই আমি মনে করি, এই পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ।”
তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি শুধু লোকদেখানো প্রতিক্রিয়া?
দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি মনে করেন,
“এটি মূলত লোকদেখানো স্বীকৃতি। পশ্চিমা নেতারা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় চাপের মুখে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে তারা কিছু একটা করেছেন। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট।”
ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রায় এই স্বীকৃতির তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আসছে না।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজারেরও বেশি।অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় ১ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংগঠন গাজায় চলমান অভিযানকে জাতিগত হত্যাযজ্ঞ (Genocide) আখ্যা দিয়েছে।
স্বাধীন গবেষক ক্রিস ওসিক বলেন,
“এই স্বীকৃতির পাশাপাশি যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র অবরোধ এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনে নো ফ্লাই জোন বাস্তবায়ন না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আশাবাদী হতে পারছি না।”
যদিও এই স্বীকৃতিকে অনেকেই প্রতীকী বলছেন, তবু ফিলিস্তিনের জন্য এতে কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তারা নতুন রাষ্ট্রীয় চুক্তি করতে পারবে।রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে পারবে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যেই হুসাম জোমলটকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ প্রয়োজন—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে বড় বাধা। তাই বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন সমর্থন ছাড়া এসব স্বীকৃতি ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘে নতুন কোনো বিশেষ সুবিধা এনে দেবে না।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পশ্চিমা দেশগুলো মূলত বহুমুখী চাপের কারণে এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
একদিকে ইসরায়েলপন্থী শক্তিশালী লবি।অন্যদিকে জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ও গণআন্দোলন, যারা যুদ্ধবিরতি ও মানবাধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান দাবি করছে।রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে মানবিক ভাবমূর্তি জিইয়ে রাখার চেষ্টা।
আবু রাসের ভাষায়: “এটি ছিল কম ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু মুখ বাঁচানোর পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল। নেতারা জনগণকে শান্ত রাখতে এই স্বীকৃতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।”
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি করলে তারা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে এবং দূতাবাস চালু করবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, “দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে এগিয়ে নিতে এবং ইসরায়েল–ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে” এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি গাজায় চলমান যুদ্ধ বা দখলদার নীতিকে থামাতে সক্ষম হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, কার্যকর চাপ—যেমন নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র অবরোধ ও কূটনৈতিক বর্জন ছাড়া—শুধু স্বীকৃতি দিয়ে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
সুত্রঃ আল–জাজিরা