ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়ে সান মারিনোকে হারালো বাংলাদেশ
মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে…
মেলবোর্ন, ১৭ অক্টোবর: ইদানীং রাজনীতিতে এক নতুন ট্রেন্ড এসেছে যার হাতে মাইক, তার মুখে ইতিহাস। কেউ বলছেন শেখ মুজিব “চেয়ার দিয়ে পিটিয়েছিলেন,” কেউ বলছেন আওয়ামী লীগ জন্ম থেকেই “সন্ত্রাসী দল।” শুনে মনে হয়, বাংলাদেশে ইতিহাস নয়, বরং মাইক্রোফোনই এখন প্রধান তথ্যসূত্র।
এক সময় ইতিহাস লিখতেন গবেষকেরা; এখন ইতিহাস বানাচ্ছেন বক্তারা কখনো লন্ডনের কোনো গোপন কক্ষে, কখনো ঢাকার টকশো স্টুডিওতে। আর আশ্চর্যের বিষয়, যারা অতীতে গুম, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, নির্বাচন কারচুপি, আর আন্তর্জাতিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত তারাই আজ শেখ হাসিনাকে “স্বৈরাচারী” বলছেন। যেন এক দুর্নীতিবাজ আরেক দুর্নীতিবাজ কে বলছে বলছে “তুমি নাকি ঘুষ খাও?”
চোর ডাকছে পুলিশকে ‘চোর’ এই নৈতিক উল্টোচিত্রই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক নাটক।
ট্রানজিশন: মিথের বাইরে, ডেটার ভেতর
এই প্রবন্ধে আমরা ইতিহাস নয়, হিস্টেরিয়া নয় তথ্য ও তুলনামূলক সূচকের ভেতর দিয়ে দেখবো, তারেক রহমান ও ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবিগুলো কতটা সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা যাচাই করবো ফ্যাসিবাদের আটটি সূচক বিচারবহির্ভূত হত্যা (EJK), নির্বাচন কারচুপি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বন্দী, সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিচারব্যবস্থা দখল, গুম, ও মব সহিংসতা এই মানদণ্ডে কার শাসন বেশি স্বৈরাচারী ছিল: BNP (2001–06), আওয়ামী লীগ (2009–জুলাই ২০২৪), না বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (আগস্ট ২০২৪–সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
আমাদের নীতিটা সহজ: যারা “স্বৈরাচার” বলেন, তাঁদেরও একই মাপকাঠিতে দাঁড় করানো দরকার। ইতিহাসে গল্প অনেক কিন্তু সংখ্যা মিথ্যা বলে না। ডেটা মিথ্যা বলে না কিন্তু বক্তারা বলে, খুব দৃঢ় উচ্চারণে, আর সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।
বিবিসি’র সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমান দাবি করেছেন শেখ হাসিনা “স্বৈরাচার/ফ্যাসিবাদী।” হতেই পারে; তবুও কিছু কিছু মানুষের কথা শুনলে সুগুলো নিয়ে আমাদের খটকা লাগে। মনে মনে ভাবি, তাঁরা বিজ্ঞজন, আর আমরা সাধারন মানুষেরা নিতান্তই অজ্ঞ; তাঁরা “ইতিহাস” জানেন; আমরা মনে হয় জানিনা। এরপরও যত্রতত্র অজ্ঞ মানুষেরা কথা বলে চলেছেন নির্দ্বিধায়। এর মধ্যে আবার দেখা গেলো, জনাব ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ জন্ম থেকেই সন্ত্রাসী দল; তাঁর মতে, স্পিকার শাহেদ আলী স্পীকার শাহেদ আলীকে নাকি আওয়ামী লীগ পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলো; তিনি এও দাবী করেন যে, আওয়ামী লীগ মাওলানা ভাসানীকে পিটিয়েছিলো আমরা এই প্রবন্ধে দেখাবো দুটো জিনিসঃ (১) ফকরুল আলমগীরের দাবী কতটা ঐতিহাসিক সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এবং (২) তারেক রহমানের দাবীর ভিত্তিতে আমরা ঐতিহাসিক তুলনা ও সূচকভিত্তিক বিশ্লেষণ করে দেখবো বিএনপি (২০০১-২০০৬), আওয়ামী লীগ (২০০৯-জুলাই ২০২৪), ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (আগষ্ট ২০২৪- সেপ্টেম্বর ২০২৫) স্বৈরাচার/ফ্যাসিবাদী রেকর্ড কেমন। শেষেরটি করার জন্য আমরা ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার বিচারে নীচের সূচকগুলো ব্যবহার করবোঃ বিচারবহির্ভূত হত্যা (Extrajudicial Killing), নির্বাচন–প্রভাব (Election Manipulation), সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা (Freedom of Press Index), রাজনৈতিক বন্দিত্ব (Political Imrisonment), সংখ্যালঘু–সহিংসতা (Violence Against Minority), বিচারব্যবস্থা–দখল (Caputring Judiciary), গুম (Disapprearance) এবং মব–সহিংসতা (Mob Violence) এই আটটি মানদণ্ডে বিচার করে আমরা দেখবো তারেক রহমান এবং তাঁর পারিষদদের দাবী কতটা প্রণিধানযোগ্য।
আমরা আরো দুটো বিষয় নিয়ে আলাপ করবো। আমরা দুর্নীতি ও অর্থ পাচার এই দুই স্পর্শকাতর ক্ষেত্রেও কঠোর তুলনা করবো: তারেক রহমান ও BNP আমলের কেলেঙ্কারি, বিদেশি আদালতের রায়ে প্রমাণিত বা নথিবদ্ধ মামলাগুলো এক পাশে; আর আওয়ামী লীগের সময়ের অভিযোগ, মামলা ও অনুসন্ধান অন্য পাশে রেখে ডেটা, আদালত–নথি ও আন্তর্জাতিক সূচক দিয়ে মেলাবো। আমাদের মতে, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার এ দুই বিষয়ও ফ্যাসিবাদী শাসনের মূল্যায়নে প্রাসঙ্গিক। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই স্লোগান নয়, প্রমাণ–সমর্থিত বিশ্লেষণ।
পাঠক যেন নিজেই সংখ্যাগুলো দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন: “কে আসলে ফ্যাসিস্ট–প্রবণতায় এগিয়ে, আর কে তুলনামূলকভাবে কম?”
ফখরুল আলমগীরের দাবী ও ঐতিহাসিক সত্যতাঃ “বাবু যত বলে, পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ
বিএনপি’র নেতাদের জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব সব সময়ই সমস্যা। তাঁরা প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে এই দুই বিষয় টেনে আনেন; সেটি তাঁরা করতেই পারেন, কিন্তু চাই তাঁরা এগুলো প্রামানিক তথ্য দিয়ে আমাদের বলবেন, কিন্তু এই কাজটি তাঁরা প্রায়শই করেননা, কারন তাঁরা প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ; আমাদের মত অজ্ঞ মানুষদের এসব তথ্য জানানোর প্রয়োজন মনে করেননা; কিন্তু আমরা অজ্ঞ বলেই মাঝেমধ্যে জানতে চাই আমাদের প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ নেতাদের দাবীগুলো সঠিক তো? গোল বাঁধে এখানেই; কেন বলছি একথা? দেখা যাক আসল প্রামানিক তথ্য কী বলে?
একটু পেছনে যাওয়া যাক। ২০১৪ সালের ২৫ আগস্ট লন্ডনে (কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে) এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমান দাবি করেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ/শাহিদ আলীকে “চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে হত্যা” করেছেন—এবং বলেন, তিনি নাকি এটা আবুল মনসুর আহমদের একটি বইয়ে পড়েছেন। (bdnews24.com, ২৫শে আগষ্ট ২০১৪)। দেখা যাচ্ছে, জনাব আলমগীরও এখন এই একই দাবী করছেন। তারেক রহমান কতটা ইতিহাস সচেতন তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে, এবং তাঁর ইতিহাস বিষয়ে সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এর ওপর এখন যোগ হয়েছেন সুগ্রীব দোসর ফখরুল আলমগীর।
যা হোক, এবার দেখা যাক, ইতিহাসে বাবু এবং পারিষদের এই দাবী কতটা সত্য। আমাদের দাবী হলো, আবুল মনসুর আহমদের বহুল পঠিত স্মৃতিকথা “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” বইটির কোথাও তারেক এবং আলমগীরের দাবীর স্বপক্ষে বিন্দুমাত্র কোন বক্তব্য নেই। এটি শুধু আমাদের বক্তব্য নয়; ২০১৪ সালেই তারেকের বক্তব্যের পর সাংবাদিকরা যাচাই করে দেখেন, আবুল মনসুর আহমদের বইয়ে তারেকের উদ্ধৃতির মতো বর্ণনা মেলে না—অর্থাৎ “শেখ মুজিব চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছেন” এই নির্দিষ্ট দাবির প্রমাণ বইটিতে নেই। (Dhaka Tribune, ২৫ আগষ্ট ২০১৪)।
এবার সমসাময়িক মিডিয়া কী বলছে দেখা যাক। ১৯৫৮ সালের ৬ই অক্টোবর টাইম ম্যাগাজিনে “Pakistan: Death in the Chair” শিরোনামে স্পীকার শাহেদ আলীর মৃত্যুর ওপর খবরটি ছাপায়। তারা জানায় যে, ঘটনাটি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে (ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৫৮) এক তুমুল কেলেঙ্কারি/ধস্তাধস্তির মধ্যে ঘটে। টাইম ম্যাগাজিন লিখছে—বিধ্বস্ত সভায় মাইকস্ট্যান্ড/ডেস্ক প্যানেল/পেপারওয়েট ছোড়াছুড়ির মধ্যে ডেপুটি স্পিকার শাহিদ আলীর মাথায় আঘাত লাগে, তিনি রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। কোনো জায়গায় “আওয়ামী লীগ সদস্যরা পিটিয়ে মেরেছে” এমন নির্দিষ্ট বর্ণনা নেই।
আবুল মনসুর আহমদের বইতে আওয়ামী লীগ–ন্যাপ/ভাসানী–পার্থক্য, কাগমারী–উত্তর রাজনীতির টানাপোড়েন ইত্যাদি আলোচনা আছে; তবে “ভাসানীকে আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিব পিটিয়েছে”– এ ধরনের দাবির স্বীকৃত/বিশ্বাসযোগ্য উদ্ধৃতি পাওয়া যায় না। বইটির ডিজিটাল সংস্করণ/আলোচনাও উপলব্ধ।
ওপরের প্রামানিক ফ্যাক্ট চেক বিষয়ক তথ্যটি আবারো তারেক রহমান কতটা ইতিহাস সচেতন ও সত্যিকার অর্থে বই-পুস্তক পড়ে সঠিক রেফারেন্স দেয়ার মত ক্ষমতা ধারন করেন তা নিয়ে আমার মত অজ্ঞজনের যে সন্দেহ সেটিই প্রমাণ করে; কিন্তু এই একই ব্যপার যখন ফখরুল আলগীরের মত একজন এককালীন অধ্যাপক করেন তখন দুঃখই হয়। শুধু একটি কথা বলেই ফআ-প্রসঙ্গ শেষ করি। আওয়ামী লীগ “সন্ত্রাসী দল” তাঁর রাজাকার পিতা একাত্তোর পরবর্তী সময়ে বেঁচে গিয়েছিলেন, মন্ত্রী হতে পেরেছিলেন; আর ফআ নিজে ত্রিপুরায় ভারতীয় পুলিশের নির্যাতন থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতাদের কারনে। জগতের চরম ট্র্যাজেডিই বোধ হয় এই যে, উপকারীকে বাঘে খায়।
এবার প্রবন্ধের মূল অংশে আসা যাক। বিবিসি’র সাথে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দাবি করেছেন শেখ হাসিনা “স্বৈরাচার/ফ্যাসিবাদী।” আমরা ঐতিহাসিক তুলনা ও সূচকভিত্তিক মাপজোখ করলে এই রায় টেকসই হয় কিনা তা একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাই। কেবল রাষ্ট্রীয় দমন নয়, আমরা দুর্নীতি ও অর্থ পাচার এই দুই স্পর্শকাতর ক্ষেত্রেও BNP (২০০১–০৬) বনাম আওয়ামী লীগ (২০০৯–জুলাই ২০২৪)এর তুলনা টানবো, এবং ইন্টারিম (আগস্ট ২০২৪–সেপ্টেম্বর ২০২৫)–এর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও ধরবো।
স্বৈরশাসনের সেলফি: কার ফিল্টার কম, কার দাগ বেশি?: কে কাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলছে ডেটা কী বলে?
সবার আগে বুঝে নেয়া যাক ফ্যাসিবাদ বলতে কী বোঝায়। প্রচুর একাডেমিক উৎস পাওয়া যায় এটির। আমরা মোটামুটি বিখ্যাত কাজগুলোর একটি সিন্থেসিস ব্যবহার করবো সহজভাবে ফ্যাসিবাদ কী তা বোঝার জন্য।
ফ্যাসিবাদ: রাষ্ট্র/শাসক–কেন্দ্রিক ক্ষমতার একচেটিয়া কনসেনট্রেশন; বিরোধী মতের পদ্ধতিগত দমন; নির্বাচন–বিচার–প্রসিকিউশন–আমলাতন্ত্রের ইনস্টিটিউশনাল কব্জা; সংখ্যালঘু–টার্গেটিং/রাজনৈতিক সহিংসতা; এবং প্রোপাগান্ডা/মিডিয়া–কন্ট্রোল—এইসবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এতে রাষ্ট্র–সহিংসতা ও মব/ভিজিল্যান্টি সহিংসতা একে–অপরকে খাওয়ায়; দুর্নীতি–প্রণোদিত স্টেট ক্যাপচার অর্থনীতিকে রাজনৈতিক আনুগত্যে বেঁধে ফেলে। (Paxton, 2004; Payne, 1995; Linz, 2000; Levitsky & Ziblatt, 2018; RSF, 2024; Hellman, Jones, & Kaufmann, 2000; Eco, 1995).
এই সিন্থেসিস থেকেই আমরা ফ্যাসিবাদের কয়েকটি মূল স্তম্ভ নির্ধারন করে প্রতিটির বিপরীতে কার্যকর সূচকগুলো নির্বাচন করবো।
নীচে বিষয়টি দেখানো হলোঃ
| স্তম্ভ | স্তম্ভের মাপক | আমাদের সূচক |
| বলপ্রয়োগমূলক দমন | হত্যা/গুম/গণগ্রেফতার | বিচারভির্ভূত হত্যাকান্ড (Etrajudicial Killings/EJK), গুম (Disappearance), রাজনৈতিক বন্দী (Political prisoners) (ACLED; OHCHR) |
| প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি | নির্বাচন/বিচার/প্রসিকিউশন কব্জা | নির্বাচন কারচুপি (Election manipulation), বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ (Judiciary capture) (V-Dem; WJP) |
| সামাজিক আধিপত্য | সংখ্যালঘু–টার্গেটিং/মব সহিংসতা | সংখ্যালঘু নির্যাতন (Minority violence), মব সন্ত্রাস (Mob violence) (ACLED) |
| তথ্য নিয়ন্ত্রণ | মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ/সেন্সরশিপ | মিডিয়া স্বাধীনতা (Press freedom (inverted) (RSF) |
| প্যাট্রোনেজ/রেন্ট | দুর্নীতি/অর্থপাচার–ঝুঁকি | Corruption (CPI–inverted), Money-laundering risk (Basel AML) |
রেফারেন্স: ACLED, 2024a/2024b; OHCHR, 2023a/2023b; V-Dem Institute, 2024; World Justice Project, 2024a/2024b/2024c; RSF, 2024a/2024b; Transparency International, 2023; Basel Institute on Governance, 2024a/2024b/n.d.
পদ্ধতিঃ স্কোরিং, ওজন, সময়কাল
যোগফল=১
বিচারভির্ভূত হত্যাকান্ড (Etrajudicial Killings/EJK) 0.২0, নির্বাচন কারচুপি 0.১৬, মিডিয়া স্বাধীনতা (Press freedom (inverted) 0.১২, রাজনৈতিক বন্দী (Political prisoners) 0.১২, সংখ্যালঘু নির্যাতন (Minority violence) 0.১০, বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ (Judiciary capture) 0.0৯, গুম (Disappearance) 0.0৭,মব ভায়োলেন্স 0.0৫, দূর্নীতি (Corruption) 0.0৫, অর্থ পাচার ঝুঁকি (Money-laundering ris 0.0৫।
নীচে ডিফল্ট ওয়েট, এসবের যুক্তি, এবং তাদের তথ্য উৎস দেয়া হলোঃ
| সূচক | ওজন | কেন (সহজ ব্যাখ্যা) | রেফারেন্স (APA, সংক্ষিপ্ত) |
| বিচারবহির্ভূত হত্যা (EJK) | 0.২০ | জীবনাধিকার লঙ্ঘন—অপ্রতুলনীয় ক্ষতি; অন্য ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে “পুষিয়ে” যায় না | Paxton, 2004; Payne, 1995; ACLED, 2024b |
| নির্বাচনী কারচুপি (Election manipulation) | 0.১৬ | অবাধ নির্বাচন না হলে বৈধতা ক্ষয়—দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী কনসোলিডেশনের পথ | V-Dem Institute, 2024; Levitsky & Ziblatt, 2018 |
| মিডিয়ার স্বাধীনতা (Press freedom, inverted) | 0.১২ | তথ্যপ্রবাহ থামলে জবাবদিহি নিস্তেজ; RSF স্কোর উল্টো করে নিয়েছি (বেশি = খারাপ) | Reporters Without Borders, 2024a, 2024b |
| রাজনৈতিক বন্দী/গণগ্রেফতার (Political prisoners) | 0.১২ | বিরোধী শক্তিকে পদ্ধতিগতভাবে ভাঙার টুল; ভয়–ভীতি সৃষ্টি করে | Linz, 2000; ACLED, 2024b |
| সংখ্যালঘু নির্যাতন (Minority-targeted violence) | 0.১০ | ফ্যাসিস্ট রাজনীতির সামাজিক আধিপত্য স্তম্ভ; দল/রাষ্ট্রপোষিত মবকে বৈধতা | Paxton, 2004; ACLED, 2024a |
| বিচারব্যবস্থা কুক্ষিগতকরণ (Judiciary/prosecution capture) | 0.0৯ | রুল-অফ-ল ভাঙে; ধীরে বদলায় বলে EJK/ইলেকশন থেকে কিছুটা কম ওজন | World Justice Project, 2024b, 2024c; V-Dem Institute, 2024 |
| গুম (Disappearances) | 0.0৭ | ভয়–ভীতি সৃষ্টির চরম টুল; কেস-ডাটা অসম্পূর্ণ/ভ্যারিয়েশন কম ধরা পড়ে | OHCHR, 2023a, 2023b |
| মব সহিংসতা (Mob-violence) | 0.0৫ | রাষ্ট্রের সহনশীলতা/উস্কানি ইঙ্গিত; সবসময় স্টেট-অ্যাক্টর নয়—তাই কম ওজন | ACLED, 2024a |
| দুর্নীতি (Corruption; CPI inverted) | 0.0৫ | প্যাট্রোনেজ–রেন্ট–এক্সট্রাকশন → state capture; ধীর পরিবর্তনশীল, প্রাণঘাতী নয় | Transparency International, 2023; World Justice Project, 2024a; Hellman, Jones, & Kaufmann, 2000 |
| অর্থপাচার ঝুঁকি (Money-laundering risk) | 0.0৪ | Basel AML = ঝুঁকি-স্কোর (পরিমাণ নয়); শাসন ঝুঁকির প্রক্সি—তাই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ | Basel Institute on Governance, 2024a, 2024b, n.d. |
এবার দেখা যাক আমরা সব স্কোরগুলো নিয়ে ফ্যাসিবাদের কম্পোজিট কিভাবে নির্নয় করেছি। এটি সাধারন পাঠকের কাছে বোধগম্য করার জন্য উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা হলো।
খুব সহজভাবে কম্পোজিট মানে কী?
কম্পোজিট = ওজন–যুক্ত গড়।
প্রতি সূচকের (০–১০০ স্কেল) স্কোরকে তার ওজন (weight) দিয়ে গুণ করা হয়, তারপর সবগুলো যোগ করা হয়। সব ওজন মিলিয়ে ১.০০ হলে যে যোগফল পাওয়া যাবে সেটাই Fascism Index Plus (10 indicators) বা FPI10; এই স্কোর মোতাবেক উচ্চ স্কোর ফ্যাসিবাদের খারাপ অবস্থানকে নির্দেশ করে।
গণিতটা এক লাইনে এরকম:
Fascism Index Plus (10 indicators) বা FPI10 = Σ (ওজনᵢ × স্কোরᵢ)
ছোট্ট সংখ্যার উদাহরণ (১০টা সূচক, ওজনের যোগফল = ১.০০)
ধরা যাক কোনো বছরে স্কোরগুলো (০–১০০) এমন, এবং আমরা ডিফল্ট ওজনই নিচ্ছি:
| সূচক | ওজন | স্কোর | অবদান = ওজন×স্কোর |
| বিচারবহির্ভূত হত্যা (EJK) | 0.২0 | ৬0 | ১২.00 |
| নির্বাচনী কারচুপি (Election manipulation) | 0.১৬ | ৫0 | ৮.00 |
| মিডিয়ার স্বাধীনতা (Press freedom, inverted) | 0.১২ | ৭0 | ৮.৪0 |
| রাজনৈতিক বন্দী/গণগ্রেফতার (Political prisoners) | 0.১২ | ৪0 | ৪.৮0 |
| সংখ্যালঘু নির্যাতন (Minority-targeted violence) | 0.১0 | ৩0 | ৩.00 |
| বিচারব্যবস্থা কুক্ষিগতকরণ (Judiciary/prosecution capture) | 0.0৯ | ৫৫ | ৪.৯৫ |
| গুম (Disappearances) | 0.0৭ | ২0 | ১.৪0 |
| মব সহিংসতা (Mob-violence) | 0.0৫ | ২৫ | ১.২৫ |
| দুর্নীতি (Corruption; CPI inverted) | 0.0৫ | ৪৫ | ২.২৫ |
| অর্থপাচার ঝুঁকি (Money-laundering risk) | 0.0৪ | ৩৫ | ১.৪০ |
সব সুচকের যোগফল = ১২ + ৮ + ৮.৪ + ৪.৮ + ৩ + ৪.৯৫ + ১.৪ + ১.২৫ + ২.২৫ + ১.৪ = ৪৭.৪৫
অতএব, FPI10 = ৪৭.৪৫ (০–১০০; বেশি = খারাপ)
২টি ছোট বিষয় উল্লেখ করা যাকঃ
এই পদ্ধতি কেন যুক্তিযুক্ত?
কারণ প্রতিটি সূচকের স্কোর আসে প্রতিষ্ঠিত সূচক/ডেটাসেট থেকে প্রেস স্বাধীনতা (RSF), নির্বাচনী অখণ্ডতা (V-Dem), রুল অব ল’/দুর্নীতি (WJP/CPI), আর সহিংসতা/দমন (ACLED)—যেখানে সময়ভিত্তিক পরিবর্তন নিয়মিত মাপা হয়। তাই ওজন–যুক্ত গড় নিলে একসাথে “মানবাধিকার–দমন + প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি + তথ্য নিয়ন্ত্রণ + প্যাট্রোনেজ” ধরা যায়। (Reporters Without Borders, 2024; V-Dem Institute, 2024; World Justice Project, 2024; ACLED, 2024b).
সূচকভিত্তিক ফল
নীচের লেখচিত্রে ফ্যাসিবাদের দশটি সূচকে তিনটি আমলের গড় স্কোর দেখানো হয়েছে। এখানে উপাত্তের উৎসগুলো প্রতিটি ব্যাখ্যার নীচে দেয়া হয়েছে; যেমনঃ Armed Conflict Location & Event Data Project বা ACLED।
পিরিয়ড–গড় (মাস–ওজনপ্রাপ্ত): ১০টি সূচক
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষন ও ব্যাখ্যা:
১। সংখ্যালঘু নির্যাতন (Minority-targeted violence) এবং মব সহিংসতা (Mob-violence): উপাত্তসূত্রঃ ACLED, 2024a
২। নির্বাচনী কারচুপি (Election manipulation): উপাত্তসূত্রঃ V-Dem Institute, 2024
৩। গুম (Disappearances): উপাত্তসূত্রঃ OHCHR, 2023a/2023b
| সময়কাল | Disappearances (গুম) গড় স্কোর | বিশ্লেষণ |
| বিএনপি (২০০১–২০০৬) | ২০ | তুলনামূলকভাবে কম গুম – আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতেও তখন “low enforced disappearances” হিসেবে উল্লেখ ছিল। |
| আওয়ামী লীগ (২০০৯–জুলাই ২০২৪) | ৫৮.৪১ | কিছু বছরে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়, বিশেষ করে ২০১৩–২০১৮ সময়ে; তবে পরবর্তী বছরগুলোতে স্থিতিশীল হয়। |
| অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (আগষ্ট ২০২৪–সেপ্টেম্বর ২০২৫) | ১৭.৫ | সর্বনিম্ন গড়; তবে এটি “ভয়ের সংস্কৃতি” বা রিপোর্টিং গ্যাপের ফলও হতে পারে, অর্থাৎ বাস্তব গুম নয় বরং “অপ্রকাশিত”। |
৪। বিচারবহির্ভূত হত্যা (EJK) ও রাজনৈতিক বন্দী/গণগ্রেফতার (Political prisoners): উপাত্ত উৎসঃ ACLED, 2024b; RSF, 2024a/2024b; V-Dem Institute, 2024; WJP, 2024b/2024c
মূলতঃ এই দুই সূচকে উচ্চ অবস্থানে থাকলে গুমের ক্ষেত্রে স্কোর কম হবে, কারন গুমের উদ্দেশ্যটি বিচারবহির্ভূত হত্যা (EJK) ও রাজনৈতিক বন্দী/গণগ্রেফতারের মাধ্যমে কার্যকর করা যায়।
৫। মিডিয়ার স্বাধীনতা (Press freedom, inverted) ও বিচারব্যবস্থা কুক্ষিগতকরণ (Judiciary/prosecution capture): উপাত্ত সুত্রঃ
RSF 2024: রাজনৈতিক চাপ/মিডিয়া–কন্ট্রোল থিম; V-Dem/WJP: বিচার–নিয়ন্ত্রণ/রুল–অফ–ল’–এ ঝুঁকি। (RSF, 2024a/2024b; V-Dem Institute, 2024; JP, 2024b/2024c)
কম্পোজিট ফলাফল (এক নজরে)
এবার আমাদের সুচকগুলোর গড় ধরে নিয়ে কম্পোজিট ফলাফল বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথম লেখচিত্রে আমরা তিন আমলের (বিএনপি, ২০০১-২০০৬; আওয়ামী লীগ ২০০৯-জুলাই ২০২৪; এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগষ্ট ২০২৪- সেপ্টেম্বর ২০২৫)
বার চার্ট ৩ পিরিয়ড (মাস–ওজনপ্রাপ্ত):

ওপরের বার-চার্ট থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে:
সবচেয়ে খারাপ = অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (৬৮.৭);
দ্বিতীয় অবস্থান = বিএনপি (৬২.১);
সবচেয়ে কম খারাপ = আওয়ামী লীগ (৫৮.২)।
টাইমলাইন 2001–2030 (ডিফল্ট বনাম টিউনড ওজন):
নীচের চার্টে আমরা দুটো লাইন দিয়ে ডিফল্ট এবং টিউনড ওজনভিত্তিক স্কোর দেখতে পাচ্ছি। টিউনড ওয়েটে আমরা গুমের জন্য উচ্চ মান ধরেছি যেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উঠে আসা অভিযোগকে যথাযথ গুরুত্ত্ব দেয়া যায়। এতে আমাদের বিশ্লেষনের নিরপেক্ষতা রক্ষিত হবে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, টিউনড ওয়েটে আমরা গুমের জন্য ০.১২ নির্ধারন করেছি ডিফল্টের ০.০৭ ওজনের জন্য।

এই চার্টে যে ডিফল্ট এবং টিউনড ওয়েটভিত্তিক তুলনা দেয়া হয়েছে তাতে যে বিষয়টি পরিষ্কার সেটি হলো, যুক্তিযুক্ত ওজন–পরিবর্তনেও (টিউনড) ফ্যাসিবাদী পারফর্মেন্সের র্যাঙ্কিং বদলায় না। যেটি উল্লেখযোগ্য তা হলো, আওয়ামী লীগের সময় ২০১৩-১৮ পর্যন্ত আওয়ামি লীগ খারাপ করলেও এই মান অনেকটাই কমে যায় ২০১৯-২০২৪ এ, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আবার বেড়ে যায়।
(ACLED, 2024a; V-Dem Institute, 2024; RSF, 2024; WJP, 2024).
ফ্যাসিবাদের পূর্বাভাষ (২০২৫-২০৩০)
এবার দেখা যাক, ২০২৫-২০৩০ এ যদি এই তিনটি রেজিম আলাদা আলাদাভাবে ক্ষমতায় থাকে তবে ফ্যাসিবাদ চর্চায় তাদের স্কোর কেমন হয়। এখানে আমরা ডিফল্ট এবং টিউনড দুটোই বিবেচনায় নিয়েছি।

খুব সহজ পর্যবেক্ষনেই দেখা যাচ্ছে, পূর্বাভাষ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সবচেয়ে “কম খারাপ” করবে ফ্যাসিবাদ চর্চায়, যেখানে সবচেয়ে বেশী খারাপ থাকবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই। তিনটি আমলই যদি ৬৯ থেকে শুরু করে, যেটি মূলতঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বর্তমান স্কোর, তবে তিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এটি কমে ৪০ (ডিফল্ট) বা ৪৪ (টিউনড) হবে; বিএনপির জন্য এটি যথাক্রমে ৫৬ (ডিফল্ট) ও ৫৮ (ডিফল্ট), এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এটি যথাক্রমে ৬৩ (ডিফল্ট) ও ৬৪ (ডিফল্ট)।
দুর্নীতি ও অর্থপাচার–ঝুঁকি কেন জরুরি? এগুলো কী বলছে আমাদের তিন আমল নিয়ে?
যদিও আমরা ওপরে অনেকগুলো গুরুত্ত্বপূর্ন সূচক নিয়ে কথা বলেছি, দূর্নীতি সংক্রান্ত আলোচনাটি এখনো ফ্যাসিবাদী পারফরমেন্স নির্ধারনে অবশ্যই আলাদাভাবে বিবেচনার দাবী রাখে। বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে বিষয়টি বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদী আচরন মাপা সঠিক নয়; তাই আমরা এই সুচকগুলো মূল পরিমাপকে যেমন স্থান দিয়েছি, তেমনি এগুলোর একটু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছি।
আমাদের অন্য আরেকটি গবেষনামূলক প্রতিবেদনে আমরা অনেক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি (Das, 2025)। এই প্রবন্ধটি আগ্রহী পাঠকেরবোড়ে দেখতে পারেন। বর্তমান আলোচনায় আমরা উক্ত প্রবন্ধ থেকে কয়েকটি উপাত্তভিত্তিক পর্যবেক্ষন সরাসরি এখানে আবারো তুলে ধরবো।
Corruption (CPI inverted): নীচের গ্রাফে টিআইবি’র পারসেপশান ইন্ডেক্সের একটি তুলনামূল চিত্র দেয়া গেলো। এর সাথে ২০২৫-৩০ পর্যন্ত পুর্বাভাষ দেয়া হয়েছে এই পরিমাপকের। বিএনপি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ও আওয়ামী লীগের পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে কী হতে পারে এটিতে যদি এই তিন সরকার ক্ষমতায় থাকে।

BNP তুলনামূলক খারাপ; AL–এ মিশ্র প্রবণতা। (Transparency International, 2023; WJP, 2024a)। ইন্টেরিম সরকার এই সূচকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে; এই পরিস্থিতি পূর্বাভাষেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
নীচে আরেকটি লেখচিত্র দেয়া গেলো। এখানে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের Bribery Incidence বিষয়ক সূচক, Global Financial Integrity এবং UNODC নামক সংস্থার Illicit Financial Flow (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং ইত্যাদি), BASEL/AML (অর্থ পাচারের প্রবণতা) এগুলোর ভিত্তিতে একটি পূর্বাভাসমূলক চিত্র দেয়া হলো।

বিশ্লেষণ: ২০২৫–২০৩০ পূর্বাভাসে দুর্নীতি প্রবণতা
১. আওয়ামী লীগ (AL):
২. বিএনপি (BNP):
৩. ইন্টারিম সরকার (2024–2030):
এ বিষয়ে সারসংক্ষেপঃ
এই বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও দুর্নীতিনিয়ন্ত্রণমুখী নেতৃত্ব হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।
সবশেষে আমরা শেষ গুরুত্ত্বপূর্ন একটি পরিমাপক ব্যবহার করতে চাই। Basel AML Index টি দুটো জিনিস পরিমাপ করে: অর্থ পাচার (Money Laundering বা ML)) ও জংগী অর্থায়ন (Terrorist Financing বা TF) ঝুঁকি। অর্থাৎ, একটি দেশে অবৈধ অর্থ সঞ্চালন, পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এসব কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, সেটাই Basel AML Index দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
স্কোরের ব্যাখ্যা:
সূচকের উৎস/উপাদান
Basel AML Index তৈরি হয় প্রায় ১৮টি ভিন্ন উৎস (World Bank, FATF, Transparency International, WEF ইত্যাদি) থেকে, যেখানে বিবেচনা করা হয়:
অতএব, এখানে “ঝুঁকি” বলতে বোঝানো হচ্ছে অর্থপাচার ও দুর্নীতির ঝুঁকি, আয় বা অর্থনৈতিক গ্রোথের ঝুঁকি নয়।

বিশ্লেষণ: Basel AML Index Risk Score (বাংলাদেশ, 2001–2025)
BNP আমল (2001–2006, পূর্বাভাসমূলক):
গ্রাফে নীল লাইনটি BNP সময়কালকে বোঝায়। যেহেতু Basel AML Index-এর অফিসিয়াল ডেটা 2012 থেকে পাওয়া যায়, তাই এখানে BNP আমলের মানগুলো ধারণাভিত্তিক পূর্বাভাস (illustrative forecast) হিসেবে যোগ করা হয়েছে।
এই সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, এবং আন্তর্জাতিক রেটিং-এ “সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত” দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বাস্তবতা ছিল। ফলে অনুমান করা যৌক্তিক যে, Basel AML সূচকে ঝুঁকি স্কোর তখন 7.0–8.5 এর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে ছিল।
এটি প্রমাণ করে BNP আমলে অর্থ পাচার, ঘুষ, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল AML/CFT কাঠামো ছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়।
আওয়ামী লীগ আমল (2012–2024, অফিসিয়াল ডেটা):
2012 সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল 6.28, যা ধাপে ধাপে নেমে 2024 সালে দাঁড়িয়েছে 5.62।
এই প্রবণতা দেখায় যে AL আমলে Basel AML Index-এর ঝুঁকি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে গেছে মানে, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধের ক্ষমতা তুলনামূলক শক্তিশালী হয়েছে।
যদিও স্কোরে ওঠানামা আছে (2015–2016-এ কিছুটা উচ্চ মান, 2020–2021 এ উন্নতি, এবং 2022–2024-এ সামান্য অবনতি), সামগ্রিকভাবে AL শাসনকালকে বলা যায় “reform-driven improvement period।”
ইন্টারিম সরকার (2025, পূর্বাভাসমূলক):
2024-এর 5.62 থেকে 2025-এ অনুমানভিত্তিক স্কোর 6.20-এ বেড়ে গেছে, যা ঝুঁকির অবনতি নির্দেশ করে। এর মানে, অগাস্ট 2024-এ ইন্টারিম সরকার ক্ষমতায় আসার পর AML/CFT ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, প্রশাসনের অদক্ষতা, এবং জবাবদিহিতার অভাবকে এ প্রবণতা প্রতিফলিত করে।
সংক্ষেপে দূর্নীতির ঝুঁকি বিশ্লেষনে যা দেখা গেলো তা হলোঃ
তাই গ্রাফটি দেখায় দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নতি হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আমলে; আর সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল BNP ও বর্তমানে ইন্টারিম সরকারের অধীনে।
শেষ একটি বিষয় এখানে আলোচনা করতে চাই। দূর্নীতির স্কোরগুলো শুধু নয়, আমাদের দেখা দরকার এটির ফলে দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কী পরিমান অর্থকরী ক্ষতি হয়েছে। নীচের লেখচিত্রে আমরা প্রকৃত এবং পূর্বাভাষ মডেল ব্যবহার করে ১৯৯০-২০৩০ পর্যন্ত সময়ে দূর্নীতির ফলে কী পরিমান অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং হবে দেশটি তা দেখানো হয়েছে।

বিশ্লেষণ: বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ক্ষতির ধারা (১৯৯১–২০৩০)
১) বিএনপি আমল (১৯৯১–১৯৯৬; ২০০১–২০০৬)
গ্রাফের সবুজ লাইন থেকে বোঝা যায় যে, বিএনপি আমলে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের হার সর্বোচ্চ ছিল।
অর্থাৎ, বিএনপি শাসন মানেই ছিল দুর্নীতির সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।
২) আওয়ামী লীগ আমল (১৯৯৬–২০০১; ২০০৯–২০২৪)
কালো লাইনে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের দুই দফা শাসনকালেই তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং ধীরে ধীরে উন্নতি হয়েছে।
তাই AL-এর সময়কালকে বলা যায় “সুশাসন ও AML/CFT শক্তিশালীকরণের ধারাবাহিক ধারা।”
৩) ইন্টারিম সরকার (২০০৭–২০০৮; ২০২৪–২০৩০ পূর্বাভাস)
লাল ড্যাশড লাইন দেখায় যে, ইন্টারিম সরকারের সময় দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ক্ষতি ভয়াবহভাবে বেড়েছে।
এটি বোঝায় রাজনৈতিক বৈধতার অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার সংকটে ইন্টারিম সরকার দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
তাই ইন্টারিম সময়কালকে বলা যায় “সর্বোচ্চ অবনতির সময়”।
৪) তুলনামূলক মূল্যায়ন (১৯৯১–২০৩০)
এই দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে,
কোন সূচক কোন পিরিয়ডকে টেনে তোলে (কন্ট্রিবিউশন)
স্ট্যাকড কন্ট্রিবিউশন বার (পিরিয়ডভিত্তিক):

ওপরের চার্টে যা পাওয়া যাচ্ছেঃ
ধাপ ৮ সেনসিটিভিটি ও রবাস্টনেস (ওজন ±২৫%)
হিটম্যাপ (+25% / −25%):

এই ভিজ্যুয়ালটিতে দুই পাশেই হিটম্যাপ রাখা হয়েছে—
🔹 বাঁ পাশে: −২৫% (ওজন কমানো)
🔹 ডান পাশে: +২৫% (ওজন বাড়ানো)
যা বোঝায় একসাথে দেখলে:
−২৫% ও +২৫% উভয় ওজন পরিবর্তনই মডেলের স্থিতিশীলতা প্রমাণ করে।
ক্ষুদ্র ওঠানামা (বিশেষত Disappearances সূচকে) থাকলেও সামগ্রিক র্যাঙ্কিং অপরিবর্তিত থাকে যা FPI-10 composite–এর রবাস্টনেস (robustness) ও ন্যায়সংগততা (fairness) নিশ্চিত করে।
কী পাওয়া গেলো অতঃপর?
আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ বিশ্লেষনে একটি তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে আসল চিত্রটি তুলে ধরা। আমরা বিশ্বাস করি, যে কোন “মিথ বা গল্প” তৈরী করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হ্যারাস করার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে তৈরী হয়েছে সেটি থেকে বেরুনো দরকার। এটি একটি যৌক্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মানে আমাদের সহায়তা করবে। এই আশায় আমাদের আজকের আলোচনা।
সংক্ষেপে ফ্যাসিবাদ মাপতে একটা ঘটনা বা একটা সূচক নয় বহু সূচকের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখতে হয়। সেই লেন্সে আওয়ামী লীগ (২০০৯–জুলাই ২০২৪) বিএনপি (২০০১-০৬) ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (আগষ্ট ২০২৪-সেপ্টেম্বর ২০২৫) তুলনায় কম খারাপ, কিন্তু গুম বিষয়ে তাদের স্কোর সবচেয়ে বেশী;অন্যদিকে বিএনপিতে নির্বাচন–ম্যানিপুলেশন/জুডিশিয়াল–ক্যাপচার/মব–সহিংসতা/ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে সাম্প্রতিক সংখ্যালঘু–সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের স্কোর সবচেয়ে বেশী উচ্চ।
সুতরাং, সব সূচক মিলিয়ে “শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদী” এই সার্বিক দাবিটি তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষনে টেকেনা। বরং দেখা যায়, বিএনপি ও অন্তর্বর্তীকালীন ফ্যাসিস্ট–ধাঁচের আচরণ অনেক বেশি পোক্ত ও বিস্তৃত ছিল/আছে।
ডঃ শ্যামল দাস, প্রফেসর, হোমল্যান্ড সিকিওরিটি ও সমাজবিজ্ঞান, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, ইউএসএ
তথ্যসূত্রঃ
ACLED. (2024a). ACLED dataset: Bangladesh (2001–2025), political violence & protests. Armed Conflict Location & Event Data Project.
ACLED. (2024b). Methodology & codebook (v.2024). Armed Conflict Location & Event Data Project.
Basel Institute on Governance. (2024a). Basel AML Index 2024: 13th public edition. Basel Institute on Governance.
Basel Institute on Governance. (2024b). Basel AML Index methodology (2024 update). Basel Institute on Governance.
bdnews24.com. (2014, August 25). Tarique Rahman claims Mujib beat Deputy Speaker to death—citation to Abul Mansur Ahmed.
Dhaka Tribune. (2014, August 25). Fact-check: Claim about Deputy Speaker Shahid Ali and Sheikh Mujibur Rahman.
Eco, U. (1995). Ur-Fascism. The New York Review of Books, 42(11).
Hellman, J. S., Jones, G., & Kaufmann, D. (2000). Seize the state, seize the day: State capture, corruption, and influence in transition (Policy Research Working Paper No. 2444). World Bank.
Linz, J. J. (2000). Totalitarian and authoritarian regimes. Lynne Rienner.
Levitsky, S., & Ziblatt, D. (2018). How democracies die. Crown.
OHCHR. (2023a). Report on enforced disappearances and related human rights concerns in Bangladesh. Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights.
OHCHR. (2023b). Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances: Annual report (Bangladesh sections). United Nations Human Rights Council.
Paxton, R. O. (2004). The anatomy of fascism. Vintage.
Payne, S. G. (1995). A history of fascism, 1914–1945. University of Wisconsin Press.
Reporters Without Borders. (2024a). World Press Freedom Index 2024—Global methodology update. RSF.
Reporters Without Borders. (2024b). Bangladesh: 2024 country profile. RSF.
TIME. (1958, October 6). Pakistan: Death in the chair. Time.
Transparency International. (2023). Corruption Perceptions Index 2023: Country results—Bangladesh. Transparency International.
V-Dem Institute. (2024). Democracy report 2024: The autocratization surge—Bangladesh highlights. University of Gothenburg.
World Justice Project. (2024a). Rule of Law Index 2024. World Justice Project.
World Justice Project. (2024b). WJP country data: Bangladesh—Constraints on government powers & fundamental rights (2024). World Justice Project.
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au