ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর বিরুদ্ধে আবারও সরব হয়েছেন স্পেনের লা লিগা সভাপতি হ্যাভিয়ের তেবাস।
ছবিঃসংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর বিরুদ্ধে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন স্পেনের লা লিগা সভাপতি হ্যাভিয়ের তেবাস। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করার সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘ফুটবল শিল্পের জন্য ক্ষতিকর’ উল্লেখ করে তিনি ইনফ্যান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ফিফার নির্বাচন ব্যবস্থা, টুর্নামেন্ট পরিচালনা, শাস্তি প্রত্যাহার এবং হাইড্রেশন ব্রেকসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।
ইতালির ক্রীড়া দৈনিক লা গ্যাজেত্তা দেলো স্পোর্ত-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৬৩ বছর বয়সী তেবাস বলেন, বিশ্বকাপে আরও দল বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তার ভাষায়, বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর হলেও পুরো ফুটবল ক্যালেন্ডারকে একটি টুর্নামেন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা করা ঠিক নয়।
তার মতে, জাতীয় দলের সংখ্যা বাড়ানো হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া লিগগুলোর ওপর। তিনি বলেন, মাত্র ৪০ দিনের একটি টুর্নামেন্টের জন্য এমন একটি শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা সীমিত হলেও সেই টুর্নামেন্টের প্রয়োজনে পুরো ফুটবল ব্যবস্থাকে বারবার পরিবর্তন করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তেবাসের ভাষায়, আরও বেশি জাতীয় লিগকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, জাতীয় দলের সংখ্যা বাড়ানো নয়। কিন্তু ফিফা এ ক্ষেত্রে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয়। এর আগে ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল ৩২ দল নিয়ে। এরই মধ্যে ২০৩০ বিশ্বকাপে দলসংখ্যা বাড়িয়ে ৬৪ করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো যৌথভাবে আয়োজন করবে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ। তেবাসের মতে, এ ধরনের সম্প্রসারণ ফুটবলের জন্য বিপজ্জনক নজির হয়ে উঠতে পারে।
ইনফ্যান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন লা লিগা সভাপতি। আগামী বছরের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে ইনফ্যান্তিনো চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তেবাসের মতে, তার এখনই দায়িত্ব ছাড়ার সময় এসেছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান কাঠামোয় ইনফ্যান্তিনোর অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। বিভিন্ন জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সমর্থন থাকায় তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বলেই মনে করেন তিনি।
ফিফার নির্বাচন ব্যবস্থাকেও ‘অসুস্থ’ বলে আখ্যা দেন তেবাস। তার দাবি, সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগেই পরাজয়ের আশঙ্কা করেন বলে নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে না। ফলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন ফুটবল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে তার। তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ইনফ্যান্তিনোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না। তার মতে, এই নীরবতাই ফিফার বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেন তেবাস। তার অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করে ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ভূমিকা রেখেছিল। বিষয়টিকে তিনি অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ায় ঘটনাটি বড় বিতর্কে রূপ নেয়নি।
ফিফার টুর্নামেন্ট পরিচালনা নিয়েও সমালোচনা করেন তেবাস। তার অভিযোগ, সংস্থাটি ফুটবলের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
বিশ্বকাপে দীর্ঘ বিরতি এবং বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তেবাসের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে হাইড্রেশন ব্রেকের যৌক্তিকতা নেই। লা লিগার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কেবল অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতিতেই তারা এমন বিরতির অনুমতি দেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস ও আটলান্টার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামগুলোতে হাইড্রেশন ব্রেকের প্রয়োজন ছিল না। তার দাবি, এসব বিরতি মূলত বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ তৈরির জন্যই রাখা হয়েছে।
বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ, প্রতিযোগিতার সূচি, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফিফা ও জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়লেও তেবাস মনে করেন, বর্তমান ক্ষমতার ভারসাম্যের কারণে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী এখনো তৈরি হয়নি। ফলে আগামী মেয়াদেও ইনফ্যান্তিনোর দায়িত্বে বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।