বিরল খনিজ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই চলতি মাসের শেষ দিকে বৈঠকে বসতে পারেন শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ অক্টোবর- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনের বিরুদ্ধে হুমকি পৌঁছে দিচ্ছেন ধারে-ধারে শুল্ক বাড়ানো, প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদি সেসময় চীন তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিরল খনিজ (Rare Earth Elements – REEs) কে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় “Announcement No. 62 of 2025” নামে নতুন নীতি জারি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে– বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এখন থেকে এমন পণ্য রপ্তানির জন্য চীনা সরকারের অনুমোদন লাগবে, যেগুলোতে এমন উপাদান আছে যা কিনা চীনের বিরল খনিজ থেকে উৎপন্ন।
একই সঙ্গে চীন অত্যাবশ্যক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে, যাতে বিরল খনিজের সাহয্যে তৈরি স্থায়ী চুম্বক (permanent magnets), উন্নত সেন্সর, লিথিয়াম ব্যাটারি উপাদান, এমনকি মিলিটারি ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অনেক উপাদান এখন সরাসরি চীনের নিয়ন্ত্রণে আসে।
ট্রাম্প প্রশাসন উত্তেজনায় পড়ে গেছে কারণ এই নিয়ন্ত্রণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের:প্রযুক্তি ও অস্ত্র শিল্পে প্রয়োজনীয় উপাদান পেতে দেরি হচ্ছে।এখানে উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ চীন ছাড়া প্রায় অসম্ভব বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে চীনা পণ্যের ওপর ১০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে এবং বিশেষ সফটওয়্যার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণও কঠোর হবে।বিরল খনিজ শুধুই খনিজ নয়; এগুলো স্মার্টফোন, ইভি ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, যুদ্ধ-উপকরণ, ডাক্তারি যন্ত্রপাতি সহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্রে খনিজ খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিকাঠামো বহু বছর পিছিয়ে পড়েছে; চীন দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ফলে এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটি দুর্বলতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে , চীন ছাড়াই এটি দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
চীন এই খনিজকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহার করছে, যেমন: “আমরা আপনারা শুল্ক বাড়াচ্ছেন, তাহলে আমরা আমাদের খনিজ রপ্তানি সীমিত করব” এই ধরণের নির্দেশনা ট্রাম্পের নীতি-প্রচেষ্টাকে সরাসরি স্পর্শ করেছে।
রপ্তানির ওপর অনুমোদন বাধ্যতামূলক করছে, এমনকি যেখানে মাত্র সামান্য বিরল খনিজ থাকতে পারে এমন পণ্যের ক্ষেত্রেও ঋণাত্মক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের বিরল খনিজ ও চুম্বক শিল্পে তাদের প্রাধান্য বাড়ানো এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। মার্কিন বিরোধ ও শুল্ক হুমকির জবাবে বেইজিং বলেছে তারা আলোচনায় রাজি, তবে নিজের ভিত্তিতে রপ্তানি সীমাবদ্ধতা তুলে নেবে না।
সম্ভাব্য প্রভাব ও পরিণতিযুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বিশেষ করে সেনাবাহিনীর জন্য চাহিদার উপাদান বিরল খনিজ সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে বিঘœœ ঘটে যেতে পারে, বিশেষ করে এলেকট্রনিক্স, ইভি গাড়ি, নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি লড়াই নতুন পর্যায়ে গড়াতে পারে; বিশ্বের অন্য দেশগুলোও এখন বিকল্প খনিজ সরবরাহের পথে আরও ত্বরান্বিতভাবে কাজ করছে।অভ্যন্তরীণভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজস্ব খনিজ উৎপাদন এবং পরিশোধন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে, না হলে চীনের এই “ট্রাম্প কার্ড” কতটা কার্যকর হবে তা প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।
চীন আজ ‘বিরল খনিজ’ কে শুধু একটি খনিজ সম্পদ হিসেবে দেখছে না এটি একটি কৌশলগত অস্ত্র। আর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি একটি বেদনার জায়গা, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে চীনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, বেইজিং নিজেই এই স্থিতিতে বিকল্প শক্তি হয়ে উঠেছে যা ট্রাম্প ও তার নীতিকারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ রূপ নিচ্ছে।
সুত্রঃ আল–জাজিরা