সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী
দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…
মেলবোর্ন, ২৮ অক্টোবর: ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী শাসনে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও উগ্রপন্থার উত্থান এখন নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। একসময় শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার হওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন ভেঙ্গে পড়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সেক্যুলার দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী এবং ইসলামি সহানুভূতিপরদের মধ্যে দ্বন্ধে বিভাজন এখন স্পষ্ট।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আজ এমন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি যা ইতিহাসে এরকম মুখোমুখি হয়নি। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর বুধবার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক তিন মামলার আসামি ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে নেওয়া হয়েছে। গুম, অপহরণ-হত্যা এবং নির্যাতনের অভিযোগ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের সময়ের ঘটনা। প্রসঙ্গত, গুম ও খুনের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে গেলো ৮ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ডিজিএফআইয়ের সাবেক ৫ প্রধানসহ ২৫ জন সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। যা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। কারণ দেশের ইতিহাসে চাকরিরত অবস্থায় এত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা এটাই প্রথম।
গত ছয়ই অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এক সংশোধনী এনেছে। ওই সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে সেই ব্যক্তি সরকারি চাকরিজীবী হলে ওই পদে থাকতে পারবেন না বলে ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটর জানান। অপরদিকে সেনাবাহিনী দাবি করছে যে কোনও বিচার কার্যক্রম অবশ্যই সামরিক আইন অধীনে থাকতে হবে। এই ভেতরের মতবিরোধ ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর মাঝে সামঞ্জস্য স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার নিরপেক্ষতা প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবে ঐক্যবদ্ধ ও পেশাদার হওয়া সেনাবাহিনী এখন নিন্মরূপ তিনটি বিশাল শিবিরে বিভক্ত মনে হচ্ছে:
ঢাকা ও নয়া দিল্লির বিশ্লেষকরা দেখছেন যে এই বিভাজনটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিবিম্ব সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ বনাম উর্ধ্বগত ইসলামি রাজনীতি। গোয়েন্দা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পাকিস্তানের Inter‑Services Intelligence (ISI)-র সহযোগিতায় জামায়াত-ই-ইসলামি নীরবে সেনাবাহিনীর একাংশে প্রভাব পুনঃগঠন করছে। যদিও এই দাবিগুলি যাচাই সাপেক্ষ, তবে ধারণাটাই শৃঙ্খলার অভ্যন্তরে আস্থা ধ্বংস করেছে, এবং ভাবধারাগত সন্দেহ দৈনন্দিন সামরিক কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছে।
রাজনৈতিক শূন্যস্থান ও আঞ্চলিক ধাক্কা
এই গ্রেপ্তারের সময়কালে রাজনৈতিক চাপ ও ইসলামি-প্রবণ চক্রান্ত কর্মকর্তাদের বেড়ে ওঠা-এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী জাতীয় নির্বাচনের জন্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সম্ভবত একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে, কিন্তু হঠাৎ সেটি বাতিল হয়। সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা থেকে দূরে সরে যাওয়া ঢাকার বেসরকারি ও বিদেশী অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, এই ঘটনা তাদের পূর্ব সীমান্ত নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সন্ত্রাসপ্রবণ আন্দোলন প্রতিরোধের জন্য বাংলাদেশের পেশাদার সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীলতা এখন এক সীমাহীন ক্ষতি। যদি সেনাবাহিনীতে ভাবধারাগত বিপথগামীতা বা বিদেশী প্রভাব প্রবেশ করে, তাহলে তা সরাসরি ভারতের নিরাপত্তা বলয় কে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
একসময় সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত সেনাবাহিনী আজ দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরে প্রশাসনিক ও পুলিশিং দায়িত্বে বহুবার যুক্ত হওয়ায় সেনা ও বুরোক্র্যাটের ভেদরেখা স্পষ্ট হয়ে পড়েছে।
সাধারণ নাগরিকরা সেনানিবিানকে এখন রাষ্ট্ররক্ষকের বদলে রাজনৈতিক পক্ষের হেফাজতকারীরূপে দেখছেন।
এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-অজ্ঞাৎভাবে ঢাকার এক দৈনিককে বলেছিলেন “সেনাবাহিনী এক সময় ছিল জাতির ঢাল, কিন্তু এখন সেই ঢালই ভিতর থেকে ভাঙছে।” তিনি বর্ণনা করেন কিভাবে সৈনিকরা রাজনৈতিক ভৃত্যরূপে কাজ করছেন, অবৈধ সমাবেশ পাহারা দিচ্ছেন এবং দাঙ্গামূলক সহিংসতা উপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন
“সেনাবাহিনীর ঘাঁটিগুলো এখন দুর্নীতি ও স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, আর সেই ইউনিফর্ম যা একসময় গর্ব, মর্যাদা ও দেশের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক ছিল আজ মানুষের মনে সন্দেহ ও আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।”
এই বাক্যগুলো সেনাবাহিনীর ভেতরে যে অভ্যন্তরীণ হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ইউনুসের চ্যালেঞ্জ ব্যাপক। তার প্রশাসন সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রয়েছে, এবং প্রসিকিউটরের অফিসের অতিরিক্ত ওয়ারেন্ট ইস্যু করার পরিকল্পনা নেই বলেই জানানো হয়েছে। তার নীরবতা সামরিক বাহিনীকে নিজের অভ্যন্তরীণ লড়াই নিজেই মোকাবিলা করতে বাধ্য করছে। স্বাধীনতার পক্ষে সেনা কর্মকর্তারা ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সত্যিকার বিপদ শুধু গ্রেপ্তার বা ভাবধারাগত বিভাজনেই সীমাবদ্ধ নয়।
একটি বাহিনী যখন জনসাধারণের বিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য হারায়, তা আর জাতীয় রক্ষাকারী স্তম্ভ হিসেবে থেকে যেতে পারে না। যদি সেনাবাহিনী রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক বিভাজনের ওপরে বিভক্ত হয়, তাহলে তা সেই শূন্যস্থান তৈরি করতে পারে উগ্র ও চরমপন্থীরা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভিতরে এই বিভাজনে কিছু মানুষ এখন নতুন মিলিশিয়া–ধরনের গোষ্ঠীর উত্থানকে ভয় পাচ্ছে।
ভারতের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা
ভারতের জন্য এই সংকট নতুন কিছু নয়। একটি বিভাজিত বাংলাদেশি সেনাবাহিনী দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংবেদনশীল সীমান্তে স্থিতিশীলতার হুমকি বাড়াচ্ছে। এটি জয়েন্ট কাউন্টার-টেরোরিজম কোঅপারেশন দুর্বল করতে পারে, র্যাডিকাল নেটওয়ার্কদের সাহস বাড়াতে পারে, এবং ইতিমধ্যে চলমান আঞ্চলিক প্রকল্প যেমন BIMSTEC ও উপকূলীয় নিরাপত্তা সমন্বয়কে জটিল করে তুলতে পারে। নয়া দিল্লির কৌশলগত বিশ্লেষকগণ মনে করছে ঢাকার এই অস্থিরতা একটি সাবধানবার্তা।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিপদ তার সীমান্তে নেই বরং তার ঘাঁটিতেই। সেই সেনাবাহিনী যা একসময় গর্ব ও জাতীয় শক্তির প্রতীক ছিল, আজ রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বদলে নিজেকে ভূগর্ভে আয়ত্ত করতে বসেছে। ইউনুসের দুর্বল ও বিভ্রান্ত অন্তর্বর্তী শাসনাধীনে, সেই বাহিনী এখন সেক্যুলার দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী ও ইসলামি সহানুভূতিপরদের মধ্যে বিভক্ত।
এই ভাঙন শুধু সেনাবাহিনীর মধ্যে চেইন অফ কমান্ডকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছে না বরং সেই প্রতিষ্ঠানটিকে যেটি একসময় জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দাঁড়িয়েছিল তার মর্যাদাকেও ভেঙে দিয়েছে। যদি এই বিভাজন আরও গভীর হয়, তাহলে বাংলাদেশ একসময় যে সেনাবাহিনীর ওপর স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিল, সেই বাহিনীই পরিণত হতে পারে সেই আদর্শের শিকার হিসেবে-যার বিরুদ্ধে তারা একদিন যুদ্ধ করেছিল। ভারতের জন্য এর অর্থ একটি অনিরাপদ ও অস্থির সীমান্ত। আর দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এর মানে হলো সেই অশান্তি ও অনিশ্চয়তার পুনরাবর্তন, যার বিরুদ্ধে এতদিন অগ্রগতি ও সহযোগিতা একসঙ্গে লড়াই করে এসেছে।
মতামত: শ্রোশী সিংহ, আবু ওবায়িদা আরিন
প্রকাশিত হয়েছে ২৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে Firstpost-এ।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au