শেখ হাসিনার পতন কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ নয়, বরং ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৪ নভেম্বর- বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার পতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এক নতুন বই ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব অ্যান আনফিনিশড রেভলিউশন’, যেখানে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার পতন কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ নয়, বরং ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফল।
বইটি লিখেছেন দীপ হালদার, জয়দীপ মজুমদার এবং শাহিদুল হাসান খোকন। সেখানে তুলে ধরা হয়েছে শেখ হাসিনার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি শেখ হাসিনার আত্মীয়ও, তিনিই হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, “এটা সিআইএ’র দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। আমরা বুঝতে পারিনি যে ওয়াকার ইতিমধ্যেই তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এমনকি আমাদের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই, কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার কেউই প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করেনি।” তাঁর দাবি, শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দারাও হয়তো এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক হিসাব
প্রশ্ন উঠেছে, কেন যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার সরকার সরাতে চাইবে? আসাদুজ্জামান খান কামালের মতে, এর মূল কারণ ছিল বঙ্গোপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। তিনি বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিক শক্তিশালী নেতা থাকা সিআইএ’র জন্য সমস্যার। দুর্বল সরকার থাকলেই তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু আসল লক্ষ্য ছিল সেন্ট মার্টিন দ্বীপ।”
দ্বীপটি টেকনাফ থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। চীন যখন ভারত মহাসাগরে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে, তখন এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হয়ে উঠতে পারে। শেখ হাসিনা নিজেও একবার দাবি করেছিলেন যে, তাঁকে বলা হয়েছিল দ্বীপটি আমেরিকার হাতে তুলে দিলে তিনি নিশ্চিন্তে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। কিন্তু তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি আরও অভিযোগ করেন, নতুন ইউনূস সরকার ওই প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। আসাদুজ্জামান খান বলেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, আমেরিকা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দখল নেওয়ার জন্য।”
সেনা অস্থিরতা ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ
গত মাসেই সেনাবাহিনীতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। খবর ছড়ায়, সেনারা নিজেদের ১৫ জন কর্মকর্তাকে আটক করেছে। এর মধ্যেই সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সৌদি সফর বাতিল করতে বাধ্য হন।
বইয়ের লেখক দীপ হালদার বলেন, “শেখ হাসিনার পতনের কিছু আগে ওয়াকার-উজ-জামান সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। গোপালগঞ্জের দাঙ্গা হোক বা ১৫ সেনা কর্মকর্তার গ্রেফতার, সব ঘটনার পেছনেই তাঁর সম্পৃক্ততা সন্দেহ করা হচ্ছে।”
বইটিতে বলা হয়েছে, ওয়াকার-উজ-জামান ও রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন মিলেই রাজনৈতিক অস্থিরতার মঞ্চ তৈরি করেছিলেন। লেখক বলেন, “ওয়াকার দেশের মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামির অধীনে সব গোষ্ঠীকে একত্র করেছিলেন। হাসিনার সরকার ফেলার জন্য এই একত্রীকরণই ছিল মূল চাল।”
সিআইএ ও জামায়াতের যোগ
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেন, “ওয়াকারের এটাই ছিল প্রথম গোপন অ্যাসাইনমেন্ট। যিনি তাঁকে সেনাপ্রধান করেছিলেন, তাঁকেই ক্ষমতাচ্যুত করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং জামায়াত একযোগে কাজ করেছে। এমনকি জামায়াতের অনেক নেতা আইএসআই প্রশিক্ষিত।”
তিনি আরও বলেন, গত বছরের জুনে পুলিশের ওপর হামলায়ও এই জোটের ভূমিকা ছিল। ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যেও জামায়াত ও আইএসআই সদস্যদের উপস্থিতির খবর পেয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, সেনাপ্রধান সব সামলাবেন।
গণভবনের শেষ বৈঠক
হাসিনা দেশ ছাড়ার আগের দিন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, গণভবনে অনুষ্ঠিত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। আসাদুজ্জামান খান বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেছিলাম, পুলিশ ঢাকার প্রবেশমুখ থেকে সরে যাবে, যাতে আন্দোলনকারীরা ঢুকতে না পারে। ওয়াকার তখন বলেছিল, সেনাই সব সামলাবে, কাউকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে আসতে দেবে না। শেখ হাসিনা তাঁকে বিশ্বাস করেছিলেন। পরের দিন যা ঘটেছিল, তা সবাই জানেন।”
এইভাবেই বইটির সাক্ষাৎকারে তুলে ধরা হয়েছে শেখ হাসিনার পতনের পেছনের কথিত ষড়যন্ত্রের জটিল ও বিস্ফোরক বিবরণ।
সুত্রঃ টিভি নাইন বাংলা