সন্তানকে সম্পত্তি দানের পরও বাবা-মায়ের অধিকার, সংসদে বিল পাস
সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখলে রাখার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে…
মেলবোর্ন, ৫ নভেম্বর- আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের অতীত ভুলের জন্য ‘নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা’ জানিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষমা এতটাই অস্পষ্ট যে এতে মুক্তিযুদ্ধকালীন দলটির ভয়াবহ ভূমিকার উল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি।
জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমান গত ২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেন,
“১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, যারা আমাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আমরা তাদের কাছে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইছি।”
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি, কোন ঘটনার জন্য বা কী অপরাধের জন্য তিনি ক্ষমা চাচ্ছেন। বরং তিনি আরও বলেন,
“১৯৪৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত, যদি কোনো অনির্দিষ্ট দিনে কোনো অনির্দিষ্ট অপরাধ ঘটে থাকে, তার জন্যই এই ক্ষমা।”
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল এবং গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণিত। সেই রক্তাক্ত অধ্যায় এখনো দলটির ওপর ভার হয়ে আছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯–২০২৪) জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দলটির নিবন্ধন বাতিল ও কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, এবং দলটি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী প্রচারণা চালাচ্ছে। ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের পাশাপাশি তারা এখন নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ রূপে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে।
দলটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করতে “হিন্দু উইং” গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, নারীদের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কার্যক্রম শুরু করেছে, এমনকি স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ক্যাম্পেইনও করেছে।
এছাড়া দলীয় লোগো পরিবর্তনের প্রস্তাবও এসেছে। নতুন লোগোতে সবুজ পটভূমিতে একটি খোলা বইয়ের ওপর উদীয়মান সূর্য, কলম ও দাঁড়িপাল্লা রয়েছে। পুরনো লোগোতে ছিল ইসলামিক প্রতীক “আল্লাহ” শব্দের ক্যালিগ্রাফি ও “আকিমুদ্দিন” (অর্থাৎ “ইসলাম প্রতিষ্ঠা করো”) লেখা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই ক্ষমাপ্রার্থনা মূলত একটি “কম্বলসদৃশ” বা সর্বব্যাপী ক্ষমা-যেখানে অপরাধ নির্দিষ্ট নয়, দায়িত্ব স্বীকারও নেই।
ড. শফিকুর রহমান বলেন,
“আমাদের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি তার জন্য নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাই।”
একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “আমরা কোনো অপরাধ করিনি; কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়তো ভুল ছিল।”
অর্থাৎ জামায়াতের দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে থাকা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মাত্র, অপরাধ নয়।
তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী গঠনের পেছনে জামায়াতেরই ভূমিকা ছিল। তারা মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, নারী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিল নির্মমভাবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি নেই বললেই চলে। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনা কেউই নিজেদের সময়কার অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাননি।
তাই জামায়াতের এই অস্পষ্ট ক্ষমাপ্রার্থনা জনগণের কাছে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে না। বরং অনেকেই মনে করছেন, এটি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি জামায়াত সত্যিই ১৯৭১-এর ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাদের স্পষ্টভাবে বলা উচিত-
“আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করে ভয়াবহ অপরাধ করেছি। আমরা জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাই।”
এমন সরাসরি ও নির্দিষ্ট স্বীকারোক্তিই হতে পারে তাদের মুক্তির পথ।
মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত এখনো অগণিত পরিবারের বুকে তাজা। লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্মৃতি কোনো অস্পষ্ট ক্ষমায় মুছে যাবে না। বরং এমন বিবৃতি ক্ষত আরও গভীর করে তোলে।
জামায়াত চাইলে এখনো জাতির কাছে নির্দিষ্ট অপরাধ স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে পারে। তা না হলে ১৯৭১-এর ইতিহাসই হয়ে উঠবে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের আগ্নেয়গিরি।
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ও সদ্যগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি যদি জোট গঠন করে, তাহলে জামায়াতের অতীত বর্বরতার প্রসঙ্গ নিঃসন্দেহে আবার সামনে আসবে। তখন দেরিতে আসা কোনো অস্পষ্ট ক্ষমা আর কার্যকর হবে না।
ইতিহাসকে ভাষার খেলায় ঠকানো যায় না। “কম্বলসদৃশ ক্ষমা” হয়তো অস্থায়ী স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু জাতির স্মৃতি থেকে অপরাধ মুছে ফেলতে পারবে না।
জামায়াত যদি ভবিষ্যতের রাজনীতিতে টিকে থাকতে চায়, তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত স্পষ্ট, নির্দিষ্ট ও আন্তরিকভাবে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। যদিও এতে শহীদ পরিবারের ক্ষত সারবে না, তবে অন্তত রাজনৈতিকভাবে কিছুটা বিশ্বাস পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au