বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগে ভারত

  • 7:41 pm - January 16, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২১৫ বার
ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৬ জানুয়ারি- বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা যতই গতি পাচ্ছে, ততই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার চিত্র গভীর হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে নির্বাচনে বয়কটের নতুন করে আহ্বান এবং দেশজুড়ে বাড়তে থাকা সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশ ভারত গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ঢাকায় চলমান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দিল্লির নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মনোযোগ কেড়েছে।

নয়াদিল্লিতে সরকারের নীতিনির্ধারক এবং স্বাধীন কৌশল বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে। তাঁদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বহুমাত্রিক সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব কেবলমাত্র এমন একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে, যার কাছে দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণের জন্য সুস্পষ্ট জনসমর্থন থাকবে।

তবে বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আদৌ এমন কোনো সরকার উঠে আসবে কি না এবং এলেও ঢাকার উত্তাল রাজনীতিতে সেটি কতদিন টিকে থাকবে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তা বৈধতা, স্থিতিশীলতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব প্রশ্ন ভারতের প্রতিবেশী নীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

ভারতের সাবেক উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব পঙ্কজ সারান বলেন, ভারত সব সময় ঢাকার যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও বেগম খালেদা জিয়াকে ভারত রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। একইভাবে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। সারানের ভাষায়, ভারত সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নীতি অনুসরণ করেছে।

এর আগে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কূটনীতিক বর্তমান সরকার পরিবর্তনকে আকস্মিক ও সহিংস বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, এই পরিবর্তনের মধ্যে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার উপাদান ছিল, যদিও ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলের অতীত সরকার পরিবর্তনের মতো হত্যাকাণ্ড এতে দেখা যায়নি।

সারান আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক নেতা আসিফ নজরুল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার গঠনের পেছনে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অন্যতম। তিনি দাবি করেন, নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় জামায়াতে ইসলামী কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে এবং কিছু নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, জামায়াত ইসলামীর প্রতিনিধিরা নয়াদিল্লিতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং আফগান তালেবানের মাধ্যমেও যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিষয়ে দলটির নীতিগত অবস্থান কীভাবে চূড়ান্ত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিতর্কে জড়িয়ে রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই সরকারের বৈধতা সংবিধানিক প্রক্রিয়া থেকে নয়, বরং একটি বিপ্লবী মুহূর্তের গতি থেকে এসেছে।

পঙ্কজ সারান বলেন, অনেকেই মনে করেন এটি ক্ষমতার কোনো বৈধ হস্তান্তর নয়। এই ধারণা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেমন জটিল করে তুলেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

গণতান্ত্রিক বৈধতার পাশাপাশি ভারতের আরেকটি বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। মরিশাসে ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা শান্তনু মুখার্জি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশে আবারও ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে এই প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল।

গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে আওয়ামী লীগের বাদ পড়া। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, আওয়ামী লীগ কোনো প্রান্তিক দল নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দলটির অনুপস্থিতিতে নির্বাচন কার্যত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে, যা নির্বাচনের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রকে বিকৃত করছে।

যদিও বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ শাসন করেছে এবং জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া হয়ে সম্ভাব্যভাবে তারেক রহমান পর্যন্ত একটি পারিবারিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, তবে বর্তমান প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করায় জামায়াতে ইসলামী কাঠামোগত সুবিধা নিয়ে নির্বাচনে প্রবেশ করছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি জনমিতিক পরিবর্তনও ঘটছে। একবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের ভোটাররা হয়তো আর রাজারকার বনাম মুক্তিযোদ্ধা বিভাজনের ঐতিহাসিক বয়ান দ্বারা প্রভাবিত নন। এতে করে এমনিতেই অস্থির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা যুক্ত হচ্ছে।

১৯৯০ ও ২০০০ দশকের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে শান্তনু মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়গুলো অতীতে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে এবং তা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে।

এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে পাকিস্তান ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে। মুখার্জির মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে ইসলামাবাদ।

এ ছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সশস্ত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, যার প্রভাব কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তবে পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও বিশিষ্ট লেখক টি সি এ রাঘবান মনে করেন, ভারতের প্রতিক্রিয়ায় সতর্কতা জরুরি। তিনি বলেন, প্রতিবেশী নীতিতে ভারতের কিছু পুরোনো ভুল এড়িয়ে চলতে হবে।

রাঘবানের মতে, প্রথম ভুল হলো সংখ্যালঘু অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার বৈধ প্রশ্নকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয় এবং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যেমনটি নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতীতে দেখা গেছে।

দ্বিতীয় ভুল হলো প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে প্রো-ইন্ডিয়া বা অ্যান্টি-ইন্ডিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা। তাঁর মতে, বাস্তবে সব রাজনৈতিক শক্তিই নিজেদের গোষ্ঠীগত বা জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

সব দিক বিবেচনায় বিশ্লেষকদের সিদ্ধান্ত হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথে ভারতের প্রভাব স্বভাবতই সীমিত, বিশেষ করে অস্থিরতার সময়ে। গণতান্ত্রিক বৈধতা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং জঙ্গিবাদ দমনে ভারতের স্বার্থ থাকলেও সেগুলো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু অপেক্ষা করে দেখা নয়, বরং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা নির্ধারণ করা, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসতে পারে এমন নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা।

সূত্রঃ এশিয়ান নিউজ নেটওয়ার্ক

এই শাখার আরও খবর

ইরানের রাডার স্থাপনায় মার্কিন হামলার দাবি, নতুন করে উত্তেজনা

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়,…

জনতার জবানবন্দি: ইউনূস সরকারের  ১৮ মাসের দুঃশাসনে জাতি যা হারিয়েছিল

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত—৫৪৭ দিন। ইউনূস সরকার এই ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে দুঃশাসন চালিয়েছিল। “সংস্কার” এর নামে…

কোন পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উভয়…

ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়ে সান মারিনোকে হারালো বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে…

আইভীর মুক্তি: আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত নাকি নতুন সমীকরণ?

মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিএনপি সরকার সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন জামিন দিলো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে আদালত জামিন দেয় না, জামিন দেয় যারা সরকারে থাকে। তো, আইভীকে কেন…

ঈদুল গাদিরে দুই হাজারের বেশি বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দিলেন মোজতবা খামেনি

মেলবোর্ন,০৬জুন-ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল গাদির উপলক্ষে দুই হাজারের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা মওকুফ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। শুক্রবার ইরানের বিচার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au