বাংলাদেশ

বাংলাদেশের নির্বাচন, উগ্রবাদ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি

গণতন্ত্র, উগ্রবাদ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ত্রিমুখী চাপে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে? তোমোও ইওয়াতা, দ্য সানকেই এর মতামত অবলম্বনে

  • 8:08 pm - January 20, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯১ বার
কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো পত্রিকার কার্যালয়ে একদল উগ্রবাদী জনতা আগুন ধরিয়ে দেয়। ছবি: রয়টার্স

মেলবোর্ন, ২০ জানুয়ারি: ২০২৪ সালের এই সময়টায় বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আমি একটি বিশ্লেষণ লিখেছিলাম। তখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয়ের দাবি করেছিল। অন্যদিকে, সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক দমন–পীড়নের অভিযোগ তুলে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন বর্জন করেছিল। সেই ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করে।

দুই বছর পর, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বাংলাদেশ আবার সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি। তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো।
জেন–জি তরুণ প্রজন্ম ও বিরোধী দলগুলোর নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার ভেঙে পড়ে; তিনি পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বিএনপির বিজয় এখন প্রায় নিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে

প্রতিবেশী আঞ্চলিক শক্তি ভারতের জন্য এই রাজনৈতিক পরিবর্তন বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে এসেছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য আওয়ামী লীগও নয়াদিল্লির প্রতি কৃতজ্ঞ।

এর বিপরীতে, বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান রাখে—যা ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ কারণেই ভারত এখনো শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে এবং ঢাকার প্রত্যর্পণ অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। জানুয়ারিতে পাকিস্তানি সামরিক ঘোষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান ইসলামাবাদ সফরে গিয়ে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন এবং যৌথভাবে নির্মিত জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। ৮ জানুয়ারি ২০২৬, রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান। — আইএসপিআর

চীন–পাকিস্তান অক্ষ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও পাকিস্তানের কৌশলগত জোট আরও মজবুত হয়েছে, যা ভারতের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। কাশ্মীর অঞ্চলে ২০২৫ সালে ভারত–পাকিস্তান সংঘর্ষে চীনা ও পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হয়। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সামরিক ঝোঁক নয়াদিল্লির উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

একই সঙ্গে, হাসিনা আমলে নিষিদ্ধ থাকা ইসলামপন্থী দলগুলো আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ সরকারে তাদের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট। ভারতের জন্য—যে দেশ বারবার উগ্রবাদী হামলার শিকার হয়েছে—এটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

সহিংসতা ও জনঅসন্তোষ

দুই দেশের টানাপোড়েন এখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ইনকিলাব নেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন—যিনি ভারতের সমালোচনায় সরব ছিলেন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। হামলাকারী ভারতে পালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশজুড়ে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি ‘ভারতঘেঁষা’ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমও হামলার শিকার হয়।

অন্যদিকে, এক হিন্দু নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনায় ভারতে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। উভয় দেশই শেষ পর্যন্ত ভিসা কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়।

নেতৃত্বের পালাবদল

ডিসেম্বরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত থাকা তার বড় ছেলে তারেক রহমান দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিএনপি যদি হাসিনা আমলের মতো বিরোধী কণ্ঠ দমন করে, তাহলে অস্থিরতা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

নতুন সরকার কীভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাবে—তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, পুরো ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও ভারসাম্যের গতিপথ নির্ধারণ করবে। গণতন্ত্র, উগ্রবাদ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ত্রিমুখী চাপে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে—সেই উত্তরই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

লেখক: তোমোও ইওয়াতা, দ্য সানকেই শিম্বুন
মূল প্রকাশ: Japan Forward
অনুবাদ: OTN Bangla

এই শাখার আরও খবর

শাহ আলীর মাজারে হামলা: কমিটি নাকি কোটি টাকার সম্পদ; নেপথ্যে কী?

মেলবোর্ন, ২৬ জুন- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরে কয়েকশ বছরের পুরোনো শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। হামলার পর থেকে…

কারা উঠল শেষ বত্রিশে, বাদ পড়ল কারা

মেলবোর্ন, ২৬ জুন- ১২ গ্রুপের মধ্যে ৬টি গ্রুপের সব ম্যাচ শেষ। এরই মধ্যে রাউন্ড অব থার্টি টুর ১৯টি দল চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বাদ পড়েছে ৮টি।…

বাংলার আত্মা: সম্প্রীতির শেকড় ও উগ্রতার অশনি সংকেত

মেলবোর্ন, ২৬ জুন- বাংলাদেশ মানে ছয় ঋতুর দেশ। এই দেশের মাটিতে যেমন পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বয়ে গেছে, তেমনি বয়ে গেছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—চার সম্প্রদায়ের যৌথ স্মৃতি।…

সাদা-কালো পতাকায় সয়লাব দেশ, নেপথ্যে কারা? অর্থ কারা দিচ্ছে?

মেলবোর্ন, ২৬ জুন- ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল– এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে।…

ওয়ান নেশনের উত্থান নিয়ে সতর্কবার্তা, অস্ট্রেলিয়ানদের ‘জেগে ওঠার’ আহ্বান

মেলবোর্ন, ২৬ জুন- অস্ট্রেলিয়ায় ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশনের জনপ্রিয়তা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির গ্রিনস দলের সিনেটর পিট হুইশ-উইলসন। তিনি অভিযোগ করেছেন,…

অস্ট্রেলিয়ায় আরও কঠোর হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আইন

মেলবোর্ন, ২৬ জুন- অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ‘জবাবদিহিহীন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au