রাজধানী ঢাকায় বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ জানুয়ারি- রাজধানী ঢাকায় বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই দুই বছরের আগে বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা যাবে না।
মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। তিনি বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১–এর আলোকে এই নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এটি বাড়ির মালিক ও ভাড়াটে উভয় পক্ষের জন্যই বাধ্যতামূলক হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, বর্তমানে ঢাকা মহানগরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস হলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট বাড়ির সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখের বেশি নয়। ফলে নগরীর একটি বড় অংশের মানুষই ভাড়াবাসায় থাকেন। গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় নগরীতে জনসংখ্যার চাপ বেড়েই চলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে একটি শহরে মানুষের আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আবাসনে ব্যয় হওয়াকে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। অথচ ঢাকায় অনেক মানুষকে তাদের আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে, যা জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে নানা জটিলতা ও অস্পষ্টতা ছিল। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম না মেনেই বারবার ভাড়া বাড়ানো হচ্ছিল। একই সঙ্গে যারা বাড়ি ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের অধিকারও যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, সেটিও এতদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন এই নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করে রাখতে হবে এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সুবিধা বজায় রাখতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটে বাড়িওয়ালাকে জানাবেন এবং বাড়িওয়ালা দ্রুত তা সমাধান করবেন।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে সম্মিলিতভাবে বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা সামনের খোলা জায়গায় সবুজায়ন করবেন। সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালাকে শর্তসাপেক্ষে প্রতিটি ভাড়াটেকে ছাদের ও মূল গেটের চাবি দিতে হবে।
ভাড়া পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ভাড়াটেকে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই প্রতি মাসে লিখিত রসিদ দিতে হবে এবং ভাড়াটেকেও স্বাক্ষরযুক্ত রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। বাড়িতে ভাড়াটের যেকোনো সময় প্রবেশাধিকার থাকবে এবং নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলার স্বার্থে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বাড়িওয়ালাকে ভাড়াটেকে জানাতে হবে ও মতামত নিতে হবে।
নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর তা কমপক্ষে দুই বছর বহাল থাকবে। ভাড়া বাড়ানো যাবে শুধুমাত্র জুন ও জুলাই মাসে এবং দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর পারস্পরিক আলোচনা সাপেক্ষে ভাড়া পরিবর্তন করা যাবে। দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না।
ভাড়াটে নির্ধারিত সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিকভাবে সতর্ক করতে হবে। এরপরও ভাড়া পরিশোধ না হলে সব বকেয়া পরিশোধের শর্তে দুই মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল ও উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ভাড়ার চুক্তি বাতিল করতে চাইলে উভয় পক্ষকে দুই মাসের নোটিশ দিতে হবে। ভাড়ার লিখিত চুক্তিপত্রে ভাড়া বাড়ানোর শর্ত, অগ্রিম ভাড়া, চুক্তির মেয়াদ এবং কখন বাড়ি ছাড়তে হবে, এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় এক থেকে তিন মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।
বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটে সমিতি গঠনের কথাও নির্দেশিকায় বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব সমিতির মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে। সেখানে সমাধান না হলে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানানো যাবে।
ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভাড়াটের অধিকার নিশ্চিত করতে এই নির্দেশিকা বাস্তবায়নে সচেতনতা বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে জোনভিত্তিক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হবে, যাতে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে উভয় পক্ষই আইন ও নির্দেশিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান।