বাংলাদেশ

ঐতিহাসিক ‘একুশের গান’ সৃষ্টির পেছনের গল্প

  • 5:49 am - February 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৬৩ বার
আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল গাফফার চৌধুরী ও আব্দুল লতিফ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২১ ফেব্রুয়ারি- বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে আবেগঘন ও অনিবার্য সংগীত হলো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, যা সবার কাছে ‘একুশের গান’ নামে পরিচিত। এই গানের কথা লিখেছিলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। তবে এর সুর নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের আলোচনা, বিতর্ক ও তথ্য বিভ্রাট।

প্রথম সুরকার: আব্দুল লতিফ

ভাষা আন্দোলনের পরপরই, ১৯৫২ সালের শেষদিকে কবিতাটিতে প্রথম সুরারোপ করেন গণসংগীতশিল্পী আব্দুল লতিফ। তাঁর সুরে গানটি কিছু সময় পরিবেশিতও হয়। অনেকের মতে, সেই সুরটি খারাপ ছিল না, কিন্তু তাতে যেন পূর্ণতা বা ব্যাপক আবেগের বিস্তার অনুপস্থিত ছিল।

পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে নতুনভাবে সুরারোপে মন দেন আলতাফ মাহমুদ। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজের সুরে গানটি পরিবেশন করেন। সেখান থেকেই নতুন সুরটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সেটিই প্রতিষ্ঠিত রূপ নেয়।

শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ ২০২১ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানান, নতুন সুর নিয়ে আব্দুল লতিফ ক্ষুব্ধ হননি। বরং আলতাফ মাহমুদের সুরের প্রশংসা করে তিনি নিজের সুর প্রত্যাহার করে নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আরোপিত মূল সুরটি হারিয়ে যায়। বহু অনুসন্ধানেও সেই সুরের কোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি।

লেখক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস এক লেখায় উল্লেখ করেন, আলতাফ মাহমুদের সুরে এমন আকর্ষণ ও আবেগ ছিল, যা শ্রোতাকে নাড়া দিত গভীরভাবে। এই সুরে গানটি জনমানসে স্থায়ী আসন পায়।

প্রথমদিকে আলতাফ মাহমুদ পুরো কবিতাটি নিজের সুরে গাইতেন। পরে তিনি নিজের সুরেই দু-তিনবার সামান্য পরিবর্তন আনেন। জানা যায়, তৃতীয়বার পরিবর্তনের পর তিনি মতামতের জন্য গণসংগীতের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শেখ লুতফর রহমান ও আব্দুল লতিফের কাছে যান। তারা দুজনই আলতাফ মাহমুদের সুরের প্রশংসা করেন।

বর্তমানে যে সুরে গানটি গাওয়া হয়, সেটি সেই তৃতীয় পরিমার্জিত রূপ। শুধু সুর নয়, কবিতার শেষের ছয়টি চরণও বাদ দেওয়া হয়। এই পরিবর্তন কবির অনুমতি নিয়েই করা হয়েছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বিস্তার

১৯৫৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে প্রথমবারের মতো আলতাফ মাহমুদের সুরে গানটি গাওয়া হয়। এরপর থেকেই এটি ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রধান সংগীতে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তাঁর চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়া-তে গানটি ব্যবহার করেন। এতে গানটির জনপ্রিয়তা আরও ছড়িয়ে পড়ে।

আজ এই গান শুধু বাংলাদেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ছাড়াও হিন্দি, ইংরেজি, ফরাসি, জাপানিসহ একাধিক ভাষায় এটি অনূদিত ও পরিবেশিত হয়েছে।

 ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কেবল একটি গান নয়; এটি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, আত্মত্যাগের প্রতীক এবং জাতিসত্তার আবেগ। আব্দুল লতিফের প্রাথমিক সুর থেকে আলতাফ মাহমুদের চূড়ান্ত সুরারোপ—এই যাত্রাপথের ভেতরেই লুকিয়ে আছে গানটির পূর্ণতা পাওয়ার ইতিহাস।

সময় পেরিয়ে আজও একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্তে এই গান ধ্বনিত হয়। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর বাঙালির চেতনার প্রকাশে এটি হয়ে উঠেছে অনিবার্য সংগীত।

শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া ‘একুশের গান’র পুরো লিরিক-

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি

জাগো নাগিনীরা জাগো জাগো নাগিনীরা জাগো জাগো

জাগো কালবোশেখীরা শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি
দিন বদলের ক্রান্তিলগনে তবু তোরা পার পাবি তবু তোরা পার পাবি
না, না, খুনে রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন

এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো

সেই আঁধারে পশুদের মুখ চেনা

তাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোড়ে এ দেশের বুকে দেশের দাবিকে রুখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এ দেশের নয় দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা বাঙালির অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি

তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজও জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি

এই শাখার আরও খবর

​১৫ আগস্ট থেকে ২১ আগস্ট: বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে রক্তাক্ত রাজনীতির অধ্যায়

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- ​বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট দুটি আলাদা তারিখ হলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্মৃতিতে এ দুটি দিন গভীরভাবে পরস্পর যুক্ত।…

রাষ্ট্রপতির শপথে গোপনীয়তার শপথ নেই কেন

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির শপথে গোপনীয়তা রক্ষার কোনো অঙ্গীকার নেই। সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে রাষ্ট্রপতির শপথবাক্য নির্ধারিত থাকলেও সেখানে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মতো রাষ্ট্রপতির জন্য…

বিদ্যুৎ আছে, তবু লোডশেডিং কেন? সমাধানের পথ কী

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট: সাভারে পল্লী বিদ্যুতের একজন গ্রাহক রোজিনা বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া জানান বিবিসি বাংলা কাছে। রোজিনার মতো আরো বেশ কয়েকজন ভোক্তার অভিযোগ,…

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদায় নিল মার্কিন বিমানবাহী রণতরি আব্রাহাম লিংকন

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট – মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর অঞ্চলটি ছেড়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। প্রায় ৫…

শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে: অমিত শাহ

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী…

১৩ বছরের কিশোরীকে পিটিয়ে অচেতন করার অভিযোগ, কুইন্সল্যান্ডের ‘অ্যাডাল্ট ক্রাইম, অ্যাডাল্ট টাইম’ আইন নিয়ে প্রশ্ন

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট: অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে ১৩ বছরের এক কিশোরীকে দুই কিশোরী মিলে মারধর করে অচেতন করে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au