বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী। ছবি : কালের কণ্ঠ
মেলবোর্ন, ২৪ ফেব্রুয়ারি- দেড় বছর ধরে প্রাসাদবন্দি জীবনের কথা উল্লেখ করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবনে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিনে তাঁকে জরুরি অবস্থা জারির জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। তবে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরে তাঁকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসতে পারেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এবং পরে জানা যায়, তিনি দেশ ছেড়েছেন। বিকেলে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান টেলিফোনে তাঁকে পরিস্থিতি অবহিত করেন। পরে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে এসে বৈঠক করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের ডেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার—এই তিনটি প্রস্তাব আসে। আলোচনা শেষে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয় এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়।
জরুরি অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি পক্ষ তাঁকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল। তাঁর দাবি, তাঁকে লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল যাতে তিনি জরুরি অবস্থা জারি করেন। তবে তিন বাহিনীর প্রধানরা সামরিক শাসন বা জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, সংবিধানের আলোকে সমাধান খুঁজতে তিনি আপিল বিভাগের মতামত চান। আদালতের পরামর্শের ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয় বলে তাঁর দাবি।

ছবি-সংগৃহীত
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তখন তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় সরকার গঠনে কিছুটা বিলম্ব হয়। বিকল্প কয়েকটি নাম আলোচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত ছাত্রনেতাদের মতামতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের কথাও উঠেছিল। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ওই ঘটনাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাষ্ট্রপতি : এসব খুবই দুঃখজনক ঘটনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় আইএসআইয়ের পতাকা ওড়ানো হয়েছে। এটা খুব ভয়ংকর ইঙ্গিত বহন করে।
মব সন্ত্রাস নিয়ে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছে।
রাষ্ট্রপতি :ঘুণে ধরার মতো ধরে ফেলেছিল মব কালচার। এইটাকে নিরুৎসাহ করা বা বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রথম পদক্ষেপটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। অবশ্যই। যেসব কাজ ওনারা করছেন এই সময়টুকুর মধ্যে, তাতে আশা করা যায় যে সামনের দিনগুলো ভালোভাবেই রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করতে পারবেন, বিশেষ করে সরকার গঠনের পর শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান ঘোষণা করেছেন, সেটি খুবই ইতিবাচক। দেশে স্থিতিশীলতা আনতে অবশ্যই মবতন্ত্র বন্ধ করতে হবে। এগুলো শক্ত হাতে দমন করতে হবে।
সদ্যঃসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
রাষ্ট্রপতি : নির্বাচন ভালো হয়েছে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। মানুষ যেন এক ধরনের মুক্তি চাইছিল।
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?
রাষ্ট্রপতি : আমার তো খুব অল্প সময় তাঁকে দেখা। টুকটাক কিছু কথা হয়েছে। দেখলাম যে রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি উনার মধ্যে আছে। এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। একটা কথা আছে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। এই কয় দিনের যে কার্যক্রম, তাতে আশাবাদী হওয়া যায়, বিশেষ করে উনার শরীরে মুক্তিযোদ্ধার রক্ত বইছে। তাই দেশের ভালো করবেন তিনি, এই বিশ্বাস রাখি। তাঁর বাবা ছিলেন রাষ্ট্রপতি, মা ছিলেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। আমি বিশ্বাস করি না যে আমরা কোনো নতুন দুর্যোগে পড়ব। তিনি যেন আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান, এটাই আমার কামনা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার আসার পর আপনার অনুভূতি কী?
এখন আমি সম্পূর্ণ চাপমুক্ত ও ভারমুক্ত (হাসি)। দেড় বছর শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করেছি। আমি এখন সম্পূর্ণ রিল্যাক্স। দেড় বছর ধরে আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, কিভাবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব, কিভাবে বঙ্গভবনকে নিরাপদ রাখব। সেই চাপ এখন পুরোপুরি চলে গেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে, গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে যে—রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন হতে পারে; নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কারো কারো নামও আসছে। এমনকি বিদেশি এক গণমাধ্যমে আপনি নাকি বলেছেন, নির্বাচনের পর আর এখানে থাকতে চান না। বিষয়টি পরিষ্কার করবেন?
রাষ্ট্রপতি : এই বক্তব্যটি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আমি যেভাবে বলেছি, সেটি সেই প্রেক্ষাপটেই বোঝা দরকার। গত ১৮ মাসে ওই সরকার আমাকে যে রকম মানসিকভাবে চাপ দিয়েছে, নানা ঘটনায় আমাকে অপমানিত করা হয়েছে, সে কারণে আমার মনে এক ধরনের ক্ষোভ জন্মেছিল। তখনই আমি বলেছিলাম, এভাবে রাষ্ট্রপতি থাকা যায় না, চলে যেতে ইচ্ছা করে। এই কথাটাই আমি রয়টার্সকে বলেছিলাম।
কিন্তু পরে এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যেন আমার মেয়াদ নেই। প্রশ্ন করা হলো, নতুন নির্বাচন হলে, নতুন সরকার এলে আপনার অবস্থান কী হবে? তখন আমি বলেছি, আমি সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত; আমার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। মানে আমার মেয়াদ আরো দুই বছর আছে। তবে আমি এটাও বলেছি, যদি একটি নির্বাচিত সরকার আসে এবং তাদের অভিপ্রায় থাকে যে আমি না থাকাই ভালো, তাহলে আমি স্বেচ্ছায় সরে যেতে প্রস্তুত। আই লাভ টু গো। মানে, তারা সে রকম ইচ্ছা পোষণ করলে আমি নিজে থেকেই চলে যেতে চাইব।
এখনো কি সেই অবস্থানটাই আছে? ধরুন, বিএনপি যদি মনে করে, তারা নিজেদের মতো রাষ্ট্রপতি চায়, সে ক্ষেত্রে আপনি কী করবেন? কিংবা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন হলে?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন :ওগুলো কেন হতে দেব? আমি একজন সচেতন মানুষ। যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে, সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব।
আপনি নিজে থেকে আর কোনো বিষয়ে বলবেন?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন :কত আর বলব? আমাকে যেন এই প্রাসাদে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে রাষ্ট্রপতি জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অংশগ্রহণ করেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে এই রেওয়াজ চলে আসছে। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকার সেই রেওয়াজে প্রতিবন্ধকতা দিয়েছে। আমাকে দুইটা ঈদের নামাজে অংশ নিতে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে যেতে দেয়নি। নিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে আমাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, আপনি ঈদের নামাজে অংশ নিতে জাতীয় ঈদগাহে যাবেন না।
এ ছাড়া বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে মূল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বঙ্গভবনেই হয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী আমরা এই দিবসগুলো বঙ্গভবনে আয়োজন করি; জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়। আমরা ওই দিবসগুলোতে প্রধান উপদেষ্টাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াত দিয়েছি; কিন্তু তিনি আসেননি। এর আগে সরকারপ্রধানরা প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। যদিও সাংবিধানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তবে এটি সৌজন্যবোধের বিষয়।
আরেকটি ঘটনা বলি, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালে আমার একটি বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। সার্জারির এক বছর পর সেখানকার হাসপাতালে আমার ফলোআপের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। সময়মতো আমি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিই। প্রত্যুত্তরে আমাকে সরাসরি নিষেধ করে দেওয়া হয়। বলা হয়, যদি প্রয়োজন হয়, বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনার ব্যবস্থা করবেন, তবু বিদেশে যাওয়া যাবে না।
একইভাবে লন্ডনে কেমব্রিজ পার্কওয়ে হসপিটালেও আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার আমাকে সেখানেও যেতে দেয়নি।
গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টা ১৪ বার বিদেশে গেছেন, অথচ আমি চিকিৎসার জন্য যেতে পারিনি। মূলত আমি যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়ি, এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমি ভেঙে পড়ে যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি; এতে তারা অসাংবিধানিকভাবে পছন্দের কাউকে বসাতে পারবে। আর এটা করতে পারলেই নির্বাচন বিলম্ব করানো বা নিজেদের ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যেত। নিজেদের মনমতো রাষ্ট্রপতি হলে যা ইচ্ছা তা-ই করা যায়—এই ভাবনা থেকেই আমার ওপর মানসিক পীড়ন চালিয়েছেন তাঁরা।
আপনি রাষ্ট্রপ্রধান। একজন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান বা তাঁর সহকর্মীরা দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপদস্থ করেছেন। এসব ঘটনার আইনি দিক সম্পর্কে কিছু কি বলবেন? সাংবিধানিকভাবে আপনি কি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারতেন না?
রাষ্ট্রপতি : অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সেটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী সরকার। আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এসব আইনি জটিলতার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে না গিয়ে এড়িয়ে যাওয়াটাকেই স্বস্তিদায়ক মনে করেছি। তাই এড়িয়ে গেছি। চিন্তা করেছি, যতটা নির্ঝঞ্ঝাট থাকা যায়। তাই নীরবেই সয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসরের পর কোন কাজে মনোনিবেশ করতে চান?
রাষ্ট্রপতি :আমি তো আইন অঙ্গনের মানুষ। জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি কোর্ট-কাচারিতে। অবসরের পর একজন আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব; যদি শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
দেড় বছর পর প্রকাশ্যে দেওয়া এই বিস্তৃত সাক্ষাৎকার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। যদিও তাঁর বিভিন্ন দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি।