অস্ট্রেলিয়া

“অস্ট্রেলিয়াতেই থাকো, দেশে ফিরলে তারা তোমাকে মেরে ফেলবে”

পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, হুমকির মুখে খেলোয়াড়দের স্বজনরা

  • 9:44 pm - March 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৮৯ বার
অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় চাওয়া ইরানের নারী ফুটবল দলের কয়েকজন সদস্যের হাসিমাখা মুহূর্ত—যার পেছনে লুকিয়ে আছে ভয় ও অনিশ্চয়তার গল্প। Image-x-Tony Burke

মেলবোর্ন ১১ মার্চ: অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় চাওয়া ইরানের নারী ফুটবল দলের সাত সদস্যের হাসিমাখা ছবি দেখলে মনে হতে পারে তারা স্বস্তিতে আছেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল এবং আবেগঘন।

সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। আশ্রয় চাওয়া সাতজনের মধ্যে একজন খেলোয়াড় হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ইরানে ফিরে যাওয়ার কথা জানান।

এই ঘটনার পেছনে কোনো সহজ বা সরল ব্যাখ্যা নেই। নতুন নতুন তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যাচ্ছে, যারা অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিংবা যারা ফিরে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন—দু’পক্ষই গভীর দ্বিধা ও আবেগের মধ্যে দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এবিসি নিউজ একটি ভয়েস নোট পেয়েছে, যেখানে ওই খেলোয়াড়ের মা ইরানি-অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রদায়ের একজন সদস্যকে উদ্দেশ করে বার্তা পাঠিয়েছেন।

মায়ের কণ্ঠে শোনা যায়: ফিরে এসো না… তারা তোমাকে মেরে ফেলবে।”

গত দেড় সপ্তাহ ধরে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে অনুষ্ঠিত নারী এশিয়ান কাপে অংশ নিচ্ছিল ইরানের দল। এ সময় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ দ্রুত বাড়তে থাকে।

সোমবার রাতে দলের পাঁচজন খেলোয়াড় তাদের তত্ত্বাবধায়কদের নজর এড়িয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। পরে আরও একজন খেলোয়াড় এবং একজন স্টাফ সদস্য মানবিক ভিসা পান। তবে তাদের মধ্যেই একজন পরে ইরানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মঙ্গলবার রাতে সিডনি বিমানবন্দরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যখন অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তারা কুয়ালালামপুরগামী বিমানে ওঠার আগে খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন।

ইরানি-অস্ট্রেলিয়ান সমাজকর্মী ডেনিজ টুপচি এবিসি নিউজকে জানান, একজন খেলোয়াড় প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেয়ে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

খেলোয়াড়টির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

এবিসি নিউজ একটি ভয়েস নোট পেয়েছে, যেখানে ওই খেলোয়াড়ের মা ইরানি-অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রদায়ের একজন সদস্যকে উদ্দেশ করে বার্তা পাঠিয়েছেন।

মায়ের কণ্ঠে শোনা যায়: ফিরে এসো না… তারা তোমাকে মেরে ফেলবে।”

টুপচি বলেন, ইরানি-অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিমানবন্দরে থাকা অবস্থায় ওই খেলোয়াড়ের কাছে বার্তাটি পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন।

তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে খেলোয়াড়টি প্রথমে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন এবং দ্রুত বিমানে উঠে পড়েন। এখন তিনি কুয়ালালামপুরে আছেন।”

তিনি বলেন, “তারা সবাই ভীষণ উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে চাপে আছে। তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন ইরানে থাকা তাদের পরিবার।”

টুপচির ধারণা, দলের একজন স্টাফ সদস্য তাকে চাপ দিয়েছেন। ওই ব্যক্তির ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং তিনি অস্ট্রেলিয়ায় দলের সরকারি প্রতিনিধিদলের অংশ ছিলেন।

আরো পড়ুন

পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে ইরানি নারী দলের সদস্যরা

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এক্সে লিখেছেন, “গত রাতে আমি ইরানের নারী ফুটবল দলের পাঁচজন খেলোয়াড়কে জানাতে পেরেছি যে তারা অস্ট্রেলিয়ায় নিরাপদে থাকতে পারেন এবং এখানে তাদের জন্য একটি ঘর আছে।” Image- from x-Tony Burke

ইরানি নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গোল্ড কোস্টে উত্তেজনা

তার মতে, ইরানি কর্মকর্তারা খেলোয়াড়দের বলছিলেন—“পরিবারের উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে দেশে ফিরে আসতে।”

টুপচি বলেন, “এই ধরনের বার্তার অর্থ হলো—তোমাদের পরিবার আমাদের হাতে জিম্মি। যদি তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করো, তাহলে তোমাদের ফিরে যেতে হবে।”

লন্ডনভিত্তিক পার্সিয়ান ভাষার সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল টিভি–র ক্রীড়া সাংবাদিক রাহা পোরবাখশ বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় থাকা অবস্থায় অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

তিনি বলেন, “তারা সবাই ভীষণ উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে চাপে আছে। তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন ইরানে থাকা তাদের পরিবার।”

পোরবাখশের দাবি, অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগেই খেলোয়াড়দের ওপর ইসলামিক শাসনব্যবস্থার পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, “তাদের ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক জামানত চাপানো হয়েছিল, পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল যে প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করা হতে পারে।”

তার মতে, কেউ কেউ তাদের প্রিয়জনদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আবার কেউ নতুন পথ বেছে নিয়েছেন।

“এই দুই সিদ্ধান্তের কোনোটি নিয়েই কাউকে বিচার করা উচিত নয়—না যারা থেকে গেছেন, না যারা ফিরে গেছেন,” বলেন তিনি।

এদিকে ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামিক রিপাবলিকের প্রসিকিউটর জেনারেলের দপ্তর অস্ট্রেলিয়ায় থাকা খেলোয়াড়দের উদ্দেশে হুমকিসূচক বিবৃতি দিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, পরিবারের উদ্বেগ দূর করতে খেলোয়াড়দের ইরানে ফিরে আসা উচিত এবং তাদের আশ্রয় প্রার্থনাকে “শত্রুদের ষড়যন্ত্র” বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দাবি করেন, অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ খেলোয়াড়দের আশ্রয় নিতে চাপ দিয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কারও ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না।

মঙ্গলবার ভোরে প্রথম পাঁচজন ইরানি নারী ফুটবলারের মানবিক ভিসার নথিতে স্বাক্ষর করেন অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। x-Tony-Burke

বার্ক বলেন, “অস্ট্রেলিয়া কাউকে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার দেশ নয়।”

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের কারণে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল।

খবরে বলা হয়েছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী মাত্র দুই দিনের বিক্ষোভে ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘটনায় ফুটবল সম্প্রদায়ের সদস্যরাও নিহত হয়েছেন।

এ কারণে অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগেই খেলোয়াড়দের ওপর কঠোর নজরদারি ও চাপ ছিল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তবে যারা দেশে ফিরে যাচ্ছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক হয়ে স্থলপথে তাদের ইরানে ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরো পড়ুন

পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে ইরানি নারী দলের সদস্যরা

ইরানি নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গোল্ড কোস্টে উত্তেজনা

এই শাখার আরও খবর

আমার মেয়ের মৃত্যুর দায় কে নেবে: আট বছরের শিশুকন্যার বাবা

মেলবোর্ন, ৬ জুন- মিরপুরে নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার শিকার আট বছরের শিশুকন্যার বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন তুলেছেন, তার মেয়ের মৃত্যুর দায় কে নেবে। তিনি বলেছেন,…

ভারতে অবৈধভাবে থাকা বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনে দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাই চায় দিল্লি

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশিসহ সব বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে এসব…

গাইবান্ধার রামমূর্তি নির্মাণ ঘিরে উত্তেজনা: কারা এবং কেন দিচ্ছে ভাঙার হুমকি?

মেলবোর্ন, ৬ জুন- গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্সে নির্মাণাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয়…

এভারেস্ট জয়ের রহস্য: ১০০ বছর পরও অজানা ম্যালোরি-আরভিনের শেষ পরিণতি

মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টকে ঘিরে অসংখ্য ইতিহাস, অর্জন ও ট্র্যাজেডির গল্প রয়েছে। তবে এসব কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী…

ইরানের রাডার স্থাপনায় মার্কিন হামলার দাবি, নতুন করে উত্তেজনা

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়,…

জনতার জবানবন্দি: ইউনূস সরকারের  ১৮ মাসের দুঃশাসনে জাতি যা হারিয়েছিল

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত—৫৪৭ দিন। ইউনূস সরকার এই ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে দুঃশাসন চালিয়েছিল। “সংস্কার” এর নামে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au