বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়ে প্রায় ১০০ ডলার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্রভাবে পড়তে শুরু করেছে। ইরানের ধারাবাহিক হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ঘোষণা দিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার নীতি অব্যাহত রাখা উচিত। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়া নিয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র এতে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারে। বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশটি আর্থিকভাবে লাভবান হয়। তার ভাষায়, তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অঙ্কের আয়।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক লাভের চেয়েও তার কাছে বড় বিষয় হলো বৈশ্বিক নিরাপত্তা। ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ইরানের মতো একটি শত্রু রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে এবং তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তা কখনোই হতে দেবেন না।
এর আগে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের সময় নিহতদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
বর্তমান সংঘাতের মধ্যে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী এলাকায় অন্তত ছয়টি তেলবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলার ফলে কয়েকটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায় এবং সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। সংস্থাটির মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট মনে করেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হলেও তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এমন আশঙ্কা অতিরঞ্জিত হতে পারে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেনি। তবে মাসের শেষের দিকে এ ধরনের অভিযান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গোপন বৈঠকে এ ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কংগ্রেসের কয়েকজন সহকারী জানিয়েছেন, যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে শিগগিরই হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধের মোট ব্যয় কিংবা যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
বুধবার কেনটাকি সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিজয় অর্জন করেছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সরকারি কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের আরও জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই দিনেই হামলায় প্রায় ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উদাহরণ হিসেবে ভারতের বোতলজাত পানির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের এই বাজারে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত। ফলে কোটি কোটি মানুষ নিরাপদ পানির জন্য বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ায় বোতল তৈরির কাঁচামাল, ঢাকনা, লেবেল এবং প্যাকেজিংয়ের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
বিশেষ করে প্লাস্টিক বোতল তৈরিতে ব্যবহৃত পলিমারের দাম সরাসরি তেলের দামের ওপর নির্ভর করে। তেলের দাম বাড়ার ফলে এই কাঁচামালের দামও দ্রুত বেড়েছে। শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, বোতল তৈরির উপকরণের দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বোতলের ঢাকনার দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে কার্টন, লেবেল এবং আঠালো টেপের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নিত্যপণ্যের বাজারে আরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সূত্রঃ রয়টার্স