সংকটে আমদানি-রপ্তানি, ছবি- সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করায় তার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে। এই পরিস্থিতির সরাসরি অভিঘাত পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি খাতে। সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়া, শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ব্র্যান্ড ক্রেতাদের অনিশ্চয়তার কারণে দেশের রপ্তানিকারকেরা এখন বড় ধরনের চাপে পড়েছেন।
বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিপিং কোম্পানি উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে সমুদ্রপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও খরচ বেড়েছে। বাড়তি শিপিং চার্জ এবং কনটেইনার সারচার্জ আরোপের কারণে রপ্তানিকারকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ক্রেতা অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে নতুন রপ্তানি আদেশ স্থগিত বা বিলম্বিত করছেন বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রপ্তানি প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, অর্থাৎ উড়োজাহাজে তৈরি পোশাকের নমুনা পাঠানো এবং ব্র্যান্ড ক্রেতাদের সঙ্গে জরুরি কাগজপত্র আদান–প্রদানও এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। আকাশপথে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সময়ও লাগছে বেশি।
এরই মধ্যে দেশের শিল্প খাত আরেকটি সংকটে পড়েছে জ্বালানি ঘাটতির কারণে। ডিজেলের অভাবে অনেক এলাকায় লোডশেডিংয়ের সময় কলকারখানায় জেনারেটর চালু রাখা যাচ্ছে না। ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ অনেক উৎপাদনমুখী কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর নতুন সারচার্জ। মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনারের ওপর অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়েছে, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে অবস্থান করা জাহাজেও এই অতিরিক্ত খরচ যোগ করা হচ্ছে। এতে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। সেক্ষেত্রে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ হারাতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো আমদানি–রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এই সংকট দীর্ঘ হলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তাঁদের মতে, বিশ্ব শান্তি রক্ষা এবং যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার উচিত বৈশ্বিক জনমত গড়ে তুলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে সংঘাত দ্রুত বন্ধ হয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে।