সৌদির সঙ্গে মিল, বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে আগেই ঈদ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ মার্চ- সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আগাম পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করা হয়েছে। চাঁদপুর, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা, নোয়াখালীসহ কয়েকটি জেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুসৃত পদ্ধতির ভিত্তিতে এসব এলাকার মুসল্লিরা প্রতিবছরের মতো এবারও একদিন আগে ঈদ উদ্যাপন করেছেন।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরিফকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি এলাকায় আগাম ঈদ উদ্যাপনের চিত্র দেখা যায়। সকাল ৯টায় সাদ্রা দরবার শরিফ মাঠে প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন দরবার শরিফের পীরজাদা আল্লামা জাকারিয়া চৌধুরী আল মাদানী। একই দিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সাদ্রা হামিদিয়া ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে আরেকটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইমামতি করেন পীরজাদা আরিফুল্লা চৌধুরী।
এ ছাড়া হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা, সমেশপুর, অলিপুর, বলাখাল, মনিহার, প্রতাপপুর, বাসারা, ফরিদগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপুর, কামতা, গল্লাক, ভুলাচোঁ, সোনাচোঁ, উভারামপুর, উটতলি, মুন্সিরহাট, কাইতাড়া, মূলপাড়া, বদরপুর, আইটপাড়া, সুরঙ্গচাইল, বালিথুবা, পাইকপাড়া, নূরপুর, সাচনমেঘ, শোল্লা, হাঁসা, গোবিন্দপুর এবং মতলব উপজেলার দশানি, মোহনপুর, পাঁচানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথক জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কচুয়া উপজেলার কিছু অংশেও আংশিকভাবে আগাম ঈদ উদ্যাপন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯২৮ সালে সাদ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা ইসহাক (রহ.) সৌদি আরবসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ উদ্যাপনের প্রথা চালু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর অনুসারীরা এখনো এই রীতি অনুসরণ করে আসছেন। সময়ের ব্যবধানে এই প্রথা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
সাদ্রা দরবার শরিফের পীরজাদা আরিফুল্লা চৌধুরী বলেন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তারা ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং রমজানের রোজা পালন করে আসছেন। শুরুতে অংশগ্রহণকারী কম থাকলেও এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ধারার অনুসারী বেড়েছে।
একইভাবে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার অন্তত ১২টি গ্রামে আগাম ঈদ উদ্যাপন করা হয়েছে। সকাল ৮টায় বোয়ালমারীর মাইটকুমড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল সাড়ে ৮টায় মাইটকুমড়া জামে মসজিদ মাঠে দ্বিতীয় জামাত হয়। এছাড়া সহস্রাইল বাজার ও রাখালতলী বাজার এলাকায় পর্যায়ক্রমে আরও জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এসব এলাকায় সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে এবং ঘরে ঘরে ঈদের খাবার প্রস্তুত করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রামের মির্জারখীল দরবার শরিফের অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন, যার প্রভাব এসব এলাকাতেও পড়েছে।
সাতক্ষীরার কয়েকটি গ্রামেও একই চিত্র দেখা গেছে। সদর উপজেলার ভাদড়া বাউখোলা গ্রামে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একটি মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা মহব্বত হোসেন। এছাড়া শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী এবং তালা উপজেলার ইসলামকাটি ইউনিয়নেও পৃথকভাবে জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এসব জামাতে অংশ নেওয়া মুসল্লিরা দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আহলে হাদিসের একটি অংশ ভিন্ন হিসাব অনুযায়ী সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে প্রতিবছর আগাম ঈদ উদ্যাপন করে থাকে। তবে জেলার অধিকাংশ এলাকায় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে পরদিন ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, কবিরহাট ও সদর উপজেলার পাঁচটি গ্রামেও শত বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রথা চালু রয়েছে। এসব এলাকার প্রায় দুই শতাধিক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি শুক্রবার সকাল ৮টায় বিভিন্ন মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে ঈদ উদ্যাপন করেন। গ্রামগুলো হলো লক্ষ্মীনারায়ণপুর, হরিণারায়নপুর, রামভল্লবপুর, বসন্তবাগ ও ফাজিলপুর।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের দেখানো পথ অনুসরণ করেই তারা এই প্রথা বজায় রেখেছেন। পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা গেলে তারা সেই হিসাব অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতিকে তারা ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে মেনে চলেন।
নোয়াখালীর একজন বাসিন্দা জানান, জন্মের পর থেকেই তিনি দেখে আসছেন, তার পরিবারের সবাই একদিন আগে রোজা রাখেন এবং আগাম ঈদ পালন করেন। ঈদের দিন নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন তারা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব এলাকায় আগাম ঈদ উদ্যাপন করা হয়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরদিন সরকারি হিসাব অনুযায়ী ঈদ উদ্যাপনের জন্যও প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামী শরিয়তে চাঁদ দেখার বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও মতভেদ থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একদিনের ব্যবধানে ঈদ উদ্যাপন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কিছু সম্প্রদায় আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখার হিসাব অনুসরণ করায় এই ভিন্নতা দেখা যায়।
এদিকে আগাম ঈদ উদ্যাপনকারী এলাকাগুলোতে উৎসবের আমেজ থাকলেও দেশের অধিকাংশ স্থানে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত দিনেই ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি চলছে। ফলে একই দেশে ভিন্ন দিনে ঈদ উদ্যাপনের এই চিত্র আবারও সামনে এলো।