সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি
মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…
মেলবোর্ন, ৩ নভেম্বর- প্রায় দুই দশক আগে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে এখনো হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। বাজারের ব্যাগ থেকে শুরু করে খাবারের মোড়ক বেশির ভাগ ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত নদী ও সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, যা বৈশ্বিক দূষণ সংকটকে আরও গভীর করছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা গ্রিনম্যাচ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে বড় অংশই এশীয় দেশগুলো থেকে আসছে। তারা মোট সমুদ্রবর্জ্যের প্রায় ৮১ শতাংশ উৎপাদন করছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফিলিপাইন (৩ লাখ ৬০ হাজার টন), ভারত (১ লাখ ৩০ হাজার টন), মালয়েশিয়া (৭৩ হাজার টন), চীন (৭১ হাজার টন), ইন্দোনেশিয়া (৫৬ হাজার টন), মিয়ানমার (৪০ হাজার টন), ব্রাজিল (৩৮ হাজার টন), ভিয়েতনাম (২৮ হাজার টন), বাংলাদেশ (২৫ হাজার টন) এবং থাইল্যান্ড (২৩ হাজার টন)।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে বিশ্বের সমুদ্রে ৭ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টন পর্যন্ত প্লাস্টিক জমে আছে, যা সামুদ্রিক প্রাণী এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক শরীফ মুসতাজিব বলেন, বাংলাদেশের প্লাস্টিক দূষণের মূল কারণ দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, “প্লাস্টিক বর্জ্য নানা উৎস থেকে সমুদ্রে পৌঁছে। সঠিক তথ্য নেই, সিটি করপোরেশনগুলোও প্লাস্টিককে সাধারণ বর্জ্য হিসেবেই দেখে। পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমতি দেয়, কিন্তু উৎপাদন বা নিষ্পত্তি মনিটর করে না। এছাড়া চিপস প্যাকেট, বোতল বা পলিথিন পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার প্রযুক্তিও আমাদের নেই।”
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি বাড়ছে
বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা মাছের প্রায় ৬০ শতাংশের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে, যা ক্যানসার, বন্ধ্যত্ব ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
গ্রিনম্যাচের প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন মানুষ বছরে গড়ে ২ লাখ ১১ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক খেয়ে ফেলতে পারে। এমনকি এই ক্ষুদ্র কণাগুলো মানুষের ফুসফুস, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কেও পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজিত এক কর্মশালায় সামুদ্রিক দূষণ বিষয়ে অধ্যাপক শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, “পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল বা ‘ঘোস্ট নেট’ সামুদ্রিক প্লাস্টিক দূষণের বড় উৎস। এসব জাল সমুদ্রের তলায় ডুবে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয় এবং মাছের মাধ্যমে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে, যার ফলে ক্যানসার, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও বন্ধ্যত্বের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।”
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৯ হাজার নৌকা ও ট্রলার প্রতি বছর ৪০ হাজার টন মাছ ধরার জাল ব্যবহার করে, যার প্রায় ৭ শতাংশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
অধ্যাপক শাহনেওয়াজ আরও বলেন, “মাছ, ঝিনুক, এমনকি কাছিমের পেটেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। জেলেরা প্রায়ই জাল ফেলে যায়, যা দূষণ বাড়ায়। পোশাক, প্রসাধনী ও গৃহস্থালি সামগ্রী থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্রে পৌঁছে জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।”
দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দূষণের মূল কারণ
পরিবেশবিদদের মতে, সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়ে গেছে।
পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমাদের ভোগের মাত্রা বেশি, কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল। পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল ছিল। এখন র্যাবকে যুক্ত করা হয়েছে যাতে প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়।”
তিনি আরও জানান, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সীমিতকরণসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“ক্লাইমেট ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে,” বলেন তিনি।
তবে বাস্তবে দেশের সর্বত্রই পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের অভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তাদের মতে, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উন্নত পুনঃপ্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি এবং জনসচেতনতা না বাড়ালে বাংলাদেশের প্লাস্টিক সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে, যা সামুদ্রিক প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সুত্রঃ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au