ঘূর্ণিঝড় ‘নারেল’ দুর্বল হলেও তাণ্ডব অব্যাহত, নর্থ কুইন্সল্যান্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ছবিঃ এবিসি নিউজ
মেলবোর্ন, ২০ মার্চ- অস্ট্রেলিয়ার নর্থ কুইন্সল্যান্ড উপকূলে আঘাত হানা শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ‘নারেল’ কিছুটা দুর্বল হয়ে ক্যাটাগরি-২ এ নেমে এলেও এর প্রভাব এখনো ভয়াবহ রয়ে গেছে। কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপ অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড়টি কার্পেন্টারিয়া উপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং পথে তীব্র বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঝড়ের তাণ্ডবে বহু গাছ উপড়ে পড়েছে, বাড়িঘরের ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অরুকুন, ওয়েইপা ও আশপাশের এলাকাগুলোতে ঝড়ের প্রভাব বেশি দেখা গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি অরুকুনের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং ঘণ্টায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার গতিতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে ঝড়ের স্থায়ী বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার, আর দমকা হাওয়ার গতি ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে, যা এখনো মারাত্মক ধ্বংসাত্মক।
আবহাওয়াবিদ আবরার শাবরেন জানিয়েছেন, ঝড়ের কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় বাতাসের তীব্রতা দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকবে এবং অন্তত আগামীকাল সকাল পর্যন্ত অরুকুন এলাকায় স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা নেই।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ওয়েইপা এলাকায় সকাল ৯টা থেকে এখন পর্যন্ত ১৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ওয়েনলক নদী অববাহিকায় এই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৮৩ মিলিমিটার ছাড়িয়েছে, ফলে নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে এবং বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অরুকুন, ওয়েইপা ও আশপাশের এলাকাগুলোতে ঝড়ের প্রভাব বেশি দেখা গেছে। ছবিঃ এবিসি নিউজ
এদিকে ঝড়ের কারণে পুরো কেপ অঞ্চলে এক হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আকাশপথে জরুরি কর্মী পাঠিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিবহন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কারণে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
অরুকুন এলাকায় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হলেই প্রযুক্তিবিদদের সেখানে পাঠিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সড়কপথেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক স্থানে গাছ পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো এসব সড়ক দ্রুত পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ওয়েইপা এলাকায় বন্যা আশঙ্কা। ছবিঃ এবিসি নিউজ
তবে এত বড় দুর্যোগের মাঝেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর না পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা জানিয়েছেন, আগাম প্রস্তুতি এবং স্থানীয়দের সচেতনতার কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, বাসিন্দারা আগেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হয়েছে। যদিও কিছু এলাকায় সামান্য বন্যা হতে পারে, তবে সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কুকটাউন অঞ্চলেও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল। জরুরি সেবা সংস্থা জানিয়েছে, তারা প্রাথমিকভাবে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করলেও বাস্তবে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাছ পড়ে যাওয়ার মতো ছোটখাটো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাছ পড়ে যাওয়ার মতো ছোটখাটো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। ছবিঃ এবিসি নিউজ
অন্যদিকে কেয়ার্নস অঞ্চলের হলওয়েজ বিচ এলাকায় সমুদ্রতীর ভাঙন হয়ে স্থানীয় লাইফসেভিং অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিল সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের মধ্যে এমন ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়নি এবং এটি এলাকাবাসীর জন্য বড় দূর্ভোগের কারণ।
ঘূর্ণিঝড় নারেলের প্রভাবে বিভিন্ন নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে, যা চলতি বছরের শুরুতে হওয়া ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঝড়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হলেও এখনো বিপজ্জনক। কেপ ইয়র্কের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সতর্কতা জারি রয়েছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলীয় টেরিটরির কিছু এলাকাতেও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে আগামী দিনগুলোতে এই ঝড়ের প্রভাব পড়তে পারে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাসিন্দাদের ঘরে অবস্থান করা, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ