অস্ট্রেলিয়ায় ঈদের নামাজে উত্তেজনা, প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ মার্চ- অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম সিডনির একটি মসজিদে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ককে লক্ষ্য করে কিছু মুসল্লি প্রতিবাদ জানায়। নামাজ শেষে বক্তব্য চলাকালে একদল উপস্থিত ব্যক্তি তাদের মসজিদ থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে শুরু করেন।
লাকেম্বা এলাকায় অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতে ঘটনাটি ঘটে , সেখানে হাজারো মুসল্লির উপস্থিতি ছিল। নামাজ শেষে বক্তব্য চলাকালে কিছু ব্যক্তি “বু টনি বার্ক, বু আলবানিজ”, “গণহত্যার সমর্থক” এবং “তাদের বের করে দাও” বলে স্লোগান দেন। তবে একই সঙ্গে অনেক মুসল্লিকে প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে স্বাগত জানাতেও দেখা যায়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও মসজিদের মঞ্চে থাকা বক্তা উপস্থিত মুসল্লিদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। অধিকাংশ মানুষ শান্তভাবে বসে থাকেন এবং বক্তব্য শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া হয়।
একজন বিক্ষোভকারী অভিযোগ করে বলেন, “আপনি তাকে সম্মানিত ব্যক্তি বলেছেন, অথচ তিনি কোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী।” আরেকজন বলেন, “আপনারা আর আমাদের প্রতিনিধিত্ব করেন না।”
ঘটনার বিষয়ে পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।
তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের অধিকাংশই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, বাইরে থেকে মসজিদে প্রবেশের সময় কেউ তাকে বাধা দেয়নি, কেবল ভেতরে অল্প কয়েকজন বিক্ষোভকারী ছিল, যাদের বিষয়টি স্থানীয়রাই সামাল দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, কাউকে জোর করে সরিয়ে নেওয়া হয়নি এবং পুরো বিষয়টি কমিউনিটির মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বক্তব্য শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি ও টনি বার্ক সেখানে অবস্থান করেন এবং পরে আয়োজকদের তত্ত্বাবধানে মসজিদ ত্যাগ করেন।
মসজিদটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান লেবানিজ মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা রাজনৈতিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গামেল খেইর বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে মসজিদের মতো ধর্মীয় স্থানে আমন্ত্রণ জানানো বিতর্কিত হতে পারে, তবে জনগণের ক্ষোভ ও দাবি সরাসরি সরকারের কাছে তুলে ধরার জন্য এ ধরনের সুযোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এটি কোনো প্রচারণামূলক আয়োজন ছিল না, বরং কমিউনিটির সমস্যাগুলো সরাসরি তুলে ধরার একটি সুযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ ও বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন, সেটিও তিনি উল্লেখ করেন।
সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, গাজায় চলমান সংঘাত এবং লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞের কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র আবেগ কাজ করছে। এসব বিষয় তাদের কাছে দূরের কোনো সমস্যা নয়। তবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সেই উদ্বেগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং সেটি তুলে ধরারই একটি উপায়।
অন্যদিকে ‘স্ট্যান্ড ফর প্যালেস্টাইন’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য মুখলিস মাহ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে প্রশ্ন তোলেন, কেন রাজনৈতিক নেতারা ধর্মীয় ও পবিত্র অনুষ্ঠানে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। তার মতে, এ ধরনের উপস্থিতি অনুপযুক্ত।
সংগঠনটি এর আগে রমজান ও ঈদের অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছে। তারা অতীতে একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের বক্তব্যও প্রচার করেছে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ দাবি করেন, তার সরকার উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ায় কিছু মানুষ অসন্তুষ্ট এবং এই বিক্ষোভ সেই প্রতিক্রিয়ারই অংশ হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বছরও ঈদের সময় একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। তখন নির্বাচনী প্রচারণার সময় একাধিক রাজনীতিবিদ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে প্রতিবাদের মুখে পড়েন।
মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি কমিউনিটির গুরুত্ব তুলে ধরে এবং ইতিবাচক বার্তা দেয়। অন্যরা এটিকে অনুপযুক্ত এবং ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং ধর্মীয় পরিসরে রাজনীতির উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সূত্রঃ