যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের সুপ্রিম লিডার মুজতবা খামেনি ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ৪ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া ঘটনায় চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় কোনো প্রভাব পড়বে না। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “না, মোটেও না। এটি যুদ্ধ। আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে আছি।” তবে ভূপাতিত বিমানের পাইলট ও ক্রু সদস্যদের উদ্ধারে চলমান তল্লাশি অভিযান নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং বিষয়টিকে ‘স্পর্শকাতর সামরিক বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফার্স নিউজ এজেন্সির সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠায়। তবে ইরান লিখিত কোনো জবাব দেয়নি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ভারী হামলা’ চালিয়ে প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে। বিশেষ করে কুয়েতের বুবিয়ান দ্বীপে একটি মার্কিন সামরিক গুদামে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে।
শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ইরানে প্রবেশ করে একটি পাইলটকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। একই সময়ে ইরান নিজেদের আকাশসীমায় একটি ইউএস এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। ধ্বংস হওয়া বিমানের দুই ক্রু ইজেকশন করে নিরাপদে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও একজন পাইলট নিখোঁজ ছিল। উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে দুটি মার্কিন হেলিকপ্টার এবং কম উচ্চতায় থাকা রিফুয়েলিং বিমান ব্যবহার করা হয়। উভয় হেলিকপ্টার ইরানি আগুনে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে নিরাপদে অবতরণে সক্ষম হয়।

ইরানে ভূপাতিত হওয়া মার্কিন বিমান। ছবিঃ সংগৃহীত
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ইউএসের এ-১০ ওয়ারথগ এটাক বিমানও হরমুজ সড়কের কাছে বিধ্বস্ত হয়। পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ বিমান ভূপাতিত করা হয়েছে ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুক্রবার ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর উপর হামলা চালায়। তেহরানের শাহিদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিজ ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরান এই হামলাকে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ” হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং খালিফা অঞ্চল ও ইস্রায়েলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের একটি পানির ডেসালিনেশন প্ল্যান্টও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য কুয়েত ও ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় র্যাপিড সেনট্রি এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা মোতায়েন করবে। শান্তি আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে; পাকিস্তানে আলোচকরা “ডেড এন্ডে” পৌঁছেছে। ট্রাম্প ইরানকে পাঠানো ১৪-পয়েন্টের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানি টেলিভিশন দর্শকদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছে, “যদি আপনি শত্রু পাইলটদের জীবিত ধরতে পারেন এবং পুলিশের হাতে তুলে দেন, তাহলে একটি মূল্যবান পুরস্কার পাবেন।” এ ঘটনা যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি যুদ্ধবিমান বন্ধুত্বপূর্ণ আগুনে হারানোর পর প্রথমবার যখন ইরান মার্কিন মিলিটারি বিমান ভূপাতিত করেছে।
পেন্টাগন বিমান ধ্বংস ও বিমানচালকের অনুপস্থিতি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনায় যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে। মনা ইয়াকুবিয়ান, সিএসআইএস-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক, বলেছেন, “যদি ইউএস পাইলটদের বন্দি বা আটক করা হয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের চ্যালেঞ্জ বাড়াবে। সংঘাত এখন জনগণের ঘরে আরও ব্যক্তিগতভাবে প্রবেশ করবে।”
এদিকে, আবু ধাবির হাবশান গ্যাস সুবিধায় একজন মিশরীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন, চারজন আহত হয়েছেন। ইস্রায়েলে ইরান ও লেবাননের হিজবোল্লাহর রকেট হামলার ফলে সাধারণ মানুষ আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন। পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় ব্যর্থ হয়েছে। তবে ফ্রান্সের মালিকানাধীন মাল্টা পতাকার একটি জাহাজ হরমুজ সড়ক দিয়ে অতিক্রম করতে পারছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে বিমান হামলা চালাতে শুরু করেছে। এই হামলায় এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও রয়েছেন। উত্তরে ইরানও জর্ডান, ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, পাশাপাশি বিশ্ববাজার ও এভিয়েশন খাতেও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।