যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবন। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১ মে- ইরানে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং সেখানে নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নাকচ হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি ৪৭-৫০ ভোটে পরাজিত হয়, যা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি করেছে।
এই ভোটাভুটি এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সময় সামরিক অভিযান চালাতে পারেন না। সেই সময়সীমা অনুযায়ী, ১ মে এই আইনি সীমা পূর্ণ হচ্ছে।
সিনেটের ভোটাভুটিতে রিপাবলিকান দলের মাত্র দুই সদস্য মেইনের সুসান কলিন্স এবং কেনটাকির র্যান্ড পল দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও ভাঙন দেখা যায়। পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যান একমাত্র ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল কংগ্রেসের ভেতরে ইরান যুদ্ধ নিয়ে গভীর বিভক্তির প্রতিফলন। যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান একরকম নয়, বরং একই দলের মধ্যেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এটি ছিল কংগ্রেসে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি। কিন্তু তা ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট যদি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই কোনো সামরিক অভিযান শুরু করেন, তবে ৬০ দিনের মধ্যে অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন না পেলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সেনা প্রত্যাহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট চাইলে অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ পান।
গত ২ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর বিষয়টি জানায়। সেই হিসাবে, শুক্রবারই এই সময়সীমা শেষ হচ্ছে। ফলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তা ফেডারেল আইনের লঙ্ঘন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিক।
ভোটের পর এক বিবৃতিতে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বলেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমাহীন নয় এবং সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ বা শান্তির বিষয়ে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ৬০ দিনের সময়সীমা কোনো পরামর্শ নয়, বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক আইন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপের জন্য সুস্পষ্ট কৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে রিপাবলিকান দলের অনেক সদস্য ডেমোক্র্যাটদের এই প্রস্তাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন। তারা সরাসরি যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে না গিয়ে বিকল্প পথের কথা ভাবছেন। এর মধ্যে রয়েছে সীমিত আকারে সামরিক অভিযান চালানোর অনুমোদন দেওয়া বা ইরানে স্থলবাহিনী মোতায়েনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা আবার মত দিয়েছেন, সরকার চাইলে অতিরিক্ত ৩০ দিনের সময় নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া উচিত বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
ওকলাহোমার সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড বলেন, এটি একটি আইন এবং তা মেনে চলা জরুরি। নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিসও পরামর্শ দিয়েছেন, প্রশাসন যদি দীর্ঘ সময় ইরানে থাকতে চায়, তাহলে দ্রুত কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া উচিত।
গত দুই মাসে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ছয়বার ইরান যুদ্ধ বন্ধে ভোটাভুটির উদ্যোগ নিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান সদস্যরা নিজেদের দলের প্রেসিডেন্টের নেওয়া সামরিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে অনাগ্রহী।
সাম্প্রতিক এই ভোটাভুটি থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন আইনপ্রণেতারা এখনো যুদ্ধ বন্ধে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। তবে সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপিটল হিলে আলোচনা আরও তীব্র হচ্ছে এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তা শুধু আইনি সংকটই তৈরি করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সিনেটের এই সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা, কংগ্রেসের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে। এখন সবার নজর, নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয় এবং কংগ্রেস কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তার ওপর।
সূত্রঃ টাইম