‘বিতর্কিত’ বাণিজ্য চুক্তির ফলোআপে ঢাকায় আসছেন মার্কিন প্রতিনিধি
মেলবোর্ন, ৫ মে- যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ’ (ইউএসটিআর)-এর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ তিন দিনের সরকারি সফরে আজ মঙ্গলবার…
মেলবোর্ন, ৫ মে- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহই প্রমাণ করছে যে শক্তি প্রয়োগ নয়, কূটনৈতিক পথই একমাত্র টেকসই সমাধান হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যখন আলোচনা এগোচ্ছিল, তখন “অশুভ শক্তির প্ররোচনায়” আবারও উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সংঘাতে জড়ানো বিপজ্জনক হতে পারে। একই সতর্কতা তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিও প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি অভিযান শুরু করেছে, যার লক্ষ্য প্রণালিতে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। তবে ইরান এই উদ্যোগকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে। আরাগচি সরাসরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ কার্যত একটি “অচলাবস্থার প্রকল্পে” পরিণত হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায়। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এই হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক’ আখ্যা দিয়ে দেশটি পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি তেহরান।

হরমুজ প্রণালি। ছবি : সংগৃহীত
এই ঘটনার পর আমিরাতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন। তারা সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকির কথা উল্লেখ করে নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছে। একই সঙ্গে আমিরাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা ‘স্তর ৩’-এ রাখা হয়েছে, যার অর্থ ভ্রমণের আগে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জরুরি নয় এমন মার্কিন সরকারি কর্মীদের আমিরাত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যদিও দূতাবাস ও কনস্যুলেট এখনো চালু রয়েছে।
এদিকে ইরানের এই হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত এসেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডাসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার রোধ করা জরুরি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানান এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি টেকসই চুক্তি প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি সংহতি জানিয়ে বলেন, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো রক্ষায় তাদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে কানাডা। তিনি উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের আহ্বান জানান।
সৌদি আরব থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান টেলিফোনে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে এই হামলার নিন্দা জানান এবং আমিরাতের নিরাপত্তায় পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর রাজনৈতিক শাখার উপপ্রধান ইয়াদুল্লাহ জাভানি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপের জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে। তার অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে প্রণালিটি উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছেন, যা নতুন করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
জাভানি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি ইরানের তুলনায় বেশি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হবে।
এদিকে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় একটি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। শিপিং কোম্পানি মেয়ার্স্ক জানিয়েছে, ‘অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স’ নামের জাহাজটি কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পারস্য উপসাগর ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছে। জাহাজটি গত ফেব্রুয়ারি থেকে সেখানে আটকে ছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করে জাহাজটি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কোম্পানিটি এই অভিযানে মার্কিন বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্কিন জাহাজ নির্বিঘ্নে পার হওয়ার দাবি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি। তিনি বলেন, যদি হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হামলা করা হয়, তাহলে ইরানকে “পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা” হবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজনে সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করা হবে।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এখন আলোচনার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি নমনীয় হয়েছে। তিনি অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ওপরও জোর দেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আহ্বান, এই দুই বিপরীত প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরান যেখানে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au