জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ মে- দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান আঞ্চলিক শক্তি ডিএমকে এবং এডিএমকে-এর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। প্রায় সাত দশক ধরে এই দুই দলের পালাবদলই রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে সেই দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় মুখ সি জোসেফ বিজয়র নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেট্রি কাজগম এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে তামিল রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১১৮টি আসন। কিন্তু কোনো দলই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়ে ওঠে টিভিকে, যারা ১০৭টি আসনে জয়লাভ করে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে এম কে স্ট্যালিনর নেতৃত্বাধীন ডিএমকে-কংগ্রেস-বাম জোট ৭৪টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে এবং ই কে পলানীস্বামীর নেতৃত্বে এডিএমকে-বিজেপি জোট পায় ৫৩টি আসন। এই ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনী পরিসংখ্যান নয়, বরং তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক কাঠামোয় গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
এই নির্বাচনে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের ফলও বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এম কে স্ট্যালিন নিজের আসনেই টিভিকে প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন। অন্যদিকে সি জোসেফ বিজয় দুটি আসনে জয় পেয়েছেন, যা তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার স্পষ্ট প্রমাণ। ফল ঘোষণার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু একটি নির্বাচনের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মানুষের অসন্তোষের প্রকাশ।
বিজয়ের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং সুচিন্তিত কৌশল। ২০২৪ সালে দল গঠনের পর থেকেই তিনি তামিলনাড়ুর বিভিন্ন প্রান্তে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ শুরু করেন। এই কর্মসূচি ছিল মূলত তরুণদের লক্ষ্য করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির বাইরে থাকা বা নিরাশ হয়ে থাকা একটি বড় ভোটারগোষ্ঠী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার শক্তিশালী উপস্থিতি, সিনেমা থেকে অর্জিত জনপ্রিয়তা এবং সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তাকে দ্রুত জনসমর্থনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
তবে এই যাত্রা একেবারে বাধাহীন ছিল না। কারুরে এক জনসভায় পদপিষ্ট হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু তার ভাবমূর্তিতে সাময়িক ধাক্কা দেয়। বিরোধীরা এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিজয় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আবারও মাঠে নামেন এবং তার সমর্থকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এই পুনরুত্থানই প্রমাণ করে, তার জনপ্রিয়তা শুধু আবেগভিত্তিক নয়, বরং একটি সংগঠিত রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বিজয়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো তিনি নিজেকে ‘বিকল্প’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। ডিএমকে এবং এডিএমকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থেকে একধরনের ক্লান্তি তৈরি করেছে ভোটারদের মধ্যে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এই দুই দলের রাজনীতিকে পুরনো ও অচল মনে করতে শুরু করেছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন বিজয়। তিনি তার রাজনৈতিক ভাষণে দুর্নীতি, কর্মসংস্থান সংকট, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে নারীদের জন্য মাসিক ভাতা ঘোষণা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি তামিল রাজনীতিতে নতুন নয়, কিন্তু বিজয় এটিকে নতুন প্রজন্মের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপস্থাপন করেছেন। এতে নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও টিভিকে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বুথভিত্তিক সংগঠন তৈরি করা, তরুণ কর্মীদের যুক্ত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণা চালানো তাদের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাদের উপস্থিতি অন্যান্য দলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ছিল।
অন্যদিকে ডিএমকে জোটের ভেতরে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কংগ্রেসসহ জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ ছিল। রাহুল গান্ধীর দলের দাবি পূরণ না হওয়ায় জোটের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়, যা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে ডিএমকের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাবও তৈরি হয়েছিল।
এডিএমকে-বিজেপি জোটও প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে থাকলেও তামিলনাড়ুর মতো আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব সীমিতই রয়ে গেছে। এই নির্বাচনে সেটিই আবার প্রমাণিত হয়েছে।
ভোটের সামাজিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তরুণ ভোটারদের বড় অংশ বিজয়ের দিকে ঝুঁকেছে। শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলে তার সমর্থন পাওয়া গেছে, যা তাকে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিয়েছে। ধর্মীয় বা জাতিগত বিভাজনের পরিবর্তে তিনি উন্নয়ন ও পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন, যা একটি বিস্তৃত ভোটব্যাংক তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
তামিল রাজনীতিতে চলচ্চিত্র তারকাদের প্রভাব নতুন নয়। অতীতে এম জি রামচন্দ্রন এবং জয়ললিতাও চলচ্চিত্র জগত থেকে উঠে এসে সফল রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বিজয়ের উত্থানকে অনেকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখলেও তার সাফল্যের গতি এবং পরিসর আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
দক্ষিণ ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক চিত্রেও এই নির্বাচন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। কেরলে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় ফিরেছে এবং বাম জোট পরাজিত হয়েছে। এই ফলাফল দেখায় যে দক্ষিণ ভারতের ভোটাররা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিবর্তনমুখী।
তামিলনাড়ুর নির্বাচনে বিজয়ের উত্থান কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা। তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই জনসমর্থনকে স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া এবং একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তামিল রাজনীতিতে নতুন এক যুগ শুরু হয়েছে এবং সেই যুগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিজয়।
সূত্রঃ আনন্দবাজার