ঢাকায় আসছেন হামজা চৌধুরী
শ্যামল সান্যাল, ঢাকা মেলবোর্ন, ৫ মে- ইংলিশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে খেলা ফুটবলার হামজা দেওয়ান চৌধুরী আকস্মিক সফরে ঢাকায় আসছেন।আজ মঙ্গলবার ঢাকায় এসে চার-পাঁচ দিন থাকার…
শ্যামল সান্যাল, ঢাকা
মেলবোর্ন, ৫ মে- দেশে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর ৫০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে গতকাল সোমবার। বিস্ময়কর হলেও সত্য,গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের কারণে মায়ের কোল থেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ৩১১টি ফুলের মতো কোমল শিশু। গড়ে প্রতিদিন৬ জন শিশুর প্রাণহানিতে বিপন্নবোধ করছেন অভিভাবকরা। সংশ্লিষ্ট মহল জানাচ্ছে,সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হআগাম পদক্ষেপ গ্রহণে চরম উদাসীনতা ও অদক্ষতা দেখানোর ফলেই দেখা দিয়েছে এই মারাত্মক পরিস্থিতি।
দেশে সরকারি ব্যবস্থায় হামের টিকাদান কর্মসূচি চলছে। হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছে এবং শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিকারের জন্য নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। কিন্তু তারপরও প্রতিদিনই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত শিশুর সংখ্যা। দিন যত যাচ্ছে ততই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে হাম পরিস্থিতি। গত ২৪ ঘণ্টায় বা এক দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে সর্বোচ্চ ১৭ মৃত্যুর রেকর্ড সৃষ্টি হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা এরকমই বলছেন। রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গুরুতর হামের রোগীরা সময়মতো আইসিইউ না পাওয়ায় অভিভাবকদের উদ্বেগ ও আতঙ্ক আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ বা পুনর্বিন্যাস না হওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার শিশুরা টিকার আওতায় না আসাÑএই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে একটি ন্যাশনাল গাইড লাইন তৈরি, চিকিৎসক-নার্সদের ওরিয়েন্টেশন এবং চিকিৎসার জন্য লজিস্টিক সাপোর্টগুলো ঠিকমতো দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেগুলো তো ঠিক মতো হয়নি। এই কাজগুলো না হওয়ার ফলে রোগী যত আক্রান্ত হচ্ছে, আনুপাতিক হারে মৃত্যুও তত হচ্ছে।’
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক এই পরিচালক বলেন, ‘টিকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর হামের সংক্রমণ ওমৃত্যু কমার বিষয়টি নির্ভর করে।কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার পর সংক্রমণ কমতে আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগবে। আক্রান্ত সংখ্যা কমলে মৃতের সংখ্যাও কমে আসবে।

সারা দেশে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি। ছবি : সংগৃহীত
জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করতে হবে, আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন,সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে তার ফল পেতে এখনও সময় লাগবে। রোগী কমে যাওয়াটা হয়তো এই মাস থেকে শুরু হবে। আর ইতোমধ্যে যারা আক্রান্ত হয়েছে এবং হচ্ছেÑ এসব রোগীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রিটিক্যাল বা গুরুতর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।এটা আরও এক মাস বা তার কম-বেশি সময় চলতে পারে। আর আজকে (সোমবার)যারা মারা গেছে তারা রবিবার বা তার আগের দিন সংক্রমিত হয়েছেÑ বিষয়টি কিন্তু তেমন নয়। তারা সংক্রমিত হয়েছে এক থেকে দেড় মাস আগে।মার্চ বা এপ্রিলে সংক্রমিত হয়েছিল। এতদিন হাসপাতালে থেকে মারা গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এখনও চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি।যাদের আইসিইউর সেবা পাওয়া দরকার তাদের প্রত্যেকের জন্য আইসিইউ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি।এখন এই মুহূর্তে যদি মৃত্যু কমাতে হয় তাহলে যতগুলো শিশু আইসিইউতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে,তাদের সবাইকে নিতে হবে।এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর একটা অংশকে শিশুদের হামের আইসিউইউ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আর এজন্য হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে অব্যশই জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করতে হবে। জরুরি ঘোষণা করা হলেই কেবল সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান, এনজিও,ডাক্তার ওস্বাস্থ্যকর্মী সবাইকে সর্বাত্মকভাবে যুক্ত করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ‘সংক্রমণ আজ কমলে কালই মৃত্যু কমবে বিষয়টি এমন নয়। সংক্রমণ কমার এক থেকে দেড় মাস পর মৃত্যু কমবে। যেসব এলাকার শিশুরা ৯৫ শতাংশ টিকার আওতায় এসেছে সেখানে সংক্রমণ কমে গেছে। এখন নতুন জায়গায় হাম ছড়াচ্ছে। সেখানে পিক উঠছে।’ তবে এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণ কমে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

ঢাকার একটি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে , ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। গত রবিবার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের প্রথমদিনে স্বাস্থ্য ওপরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রার৮১ শতাংশকে (শিশু)হামের টিকার আওতায় আনা হয়েছে।’ আর দুই-চার দিনের মধ্যে শতভাগকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে দাবি করে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘তবে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে একটু সময় লাগে।’ টিকা দেওয়ার কার্যক্রমে দৃষ্টি রাখার জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন, মে মাসের মধ্যেই হামের প্রকোপ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম পরিস্থিতি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে,গত ২৪ ঘণ্টায় সোমবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮ টা পর্যন্ত)দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও১৭জনের মৃত্যু হয়েছে; যা হামের প্রাদুর্ভাবে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় যে১৭জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। বাকি ১৫ জন মারা গেছে হামের উপসর্গে।এনিয়ে গত১৫মার্চ থেকে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে৫২ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ২৫৯ জনের মৃত্যু হলো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে,গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে১ হাজার ৩০২ জন হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে গেছে। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয় ১৫৪ জনের। গত ১৫মার্চ থেকেএ পর্যন্ত দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে গেছে ৪১ হাজার ৭৯৩ জন।এ সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জনের শরীরে। আর দেশে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৮৪২ জন।আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে২৫ হাজার১৫১জন।
গত এক দিনে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৬১৮জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯২ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১১জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামের লক্ষণ নিয়ে গত এক দিনে যে১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে,তাদের মধ্যে১১জন ঢাকা বিভাগের এবং ৪ জন চট্টগ্রাম বিভাগের। হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একজন ঢাকা বিভাগের, অন্যজন চট্টগ্রাম বিভাগের। ১এ মার্চ থেকেএপর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১২৭জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। আর রাজশাহী বিভাগে মারা গেছে ৭০ জন।
২০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শহীদ মিলন মিলনায়তনের পাশে হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ২০ শয্যা ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির কাজ চলছে। গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঢাকা মেডিকেলে এই ফিল্ড হাসপাতালটি তৈরি করা হচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশ পেলেই এটা পুরোদমে চালু করব।
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে এসি,নন-এসি বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা শুধু এটি তৈরি করে দেবেন।আর চিকিৎসাসেবা দেবেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে হাম রোগীর পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au