যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১১ মে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, এই বৈঠকে ইরান, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যসহ একাধিক স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসবে।
বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির এই দুই নেতার মধ্যে ছয় মাসেরও বেশি সময় পর এটি প্রথম সরাসরি বৈঠক হতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক বাণিজ্য বিরোধ, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বেইজিং পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৭ সালের পর এটিই ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে দুই দেশ পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করতে কয়েকটি নতুন ফোরাম গঠনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে চীন বোয়িং উড়োজাহাজ, মার্কিন কৃষিপণ্য এবং জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ক্রয়চুক্তির ঘোষণা দিতে পারে।
এছাড়া ‘বোর্ড অব ট্রেড’ এবং ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট’ গঠনের পরিকল্পনাও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এসব কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী সময়ে আরও কাজ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিষয়ে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও আলোচনা হবে। যদিও এই সপ্তাহেই চুক্তি নবায়ন হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে শেষ পর্যন্ত এই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে।
অন্যদিকে, বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে যাচ্ছে ইরান ইস্যু। চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার এবং ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানোর পর থেকে ওয়াশিংটন চীনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, যাতে বেইজিং তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে প্রভাবিত করে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাদের অভিযোগ, চীন রাশিয়া ও ইরানকে অর্থনৈতিক সহায়তা, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ এবং সম্ভাব্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। বৈঠকে এ বিষয়েও আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে তাইওয়ান প্রশ্নেও দুই দেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে ভিন্ন। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক এবং অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না। ফলে তাইওয়ান ইস্যু বৈঠকে অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং , ছবিঃ সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিও এবার আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে। মার্কিন প্রশাসন চীনের দ্রুত উন্নতমানের এআই মডেল তৈরির অগ্রগতিতে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এআই ব্যবহারে ভবিষ্যতে সংঘাত বা ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে দুই দেশের মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, দুই দেশের নেতাদের বৈঠককে কাজে লাগিয়ে এআই বিষয়ে একটি স্থায়ী যোগাযোগ চ্যানেল চালুর আলোচনা শুরু করতে চায় ওয়াশিংটন।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরেই চীনের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে চাইলেও বেইজিং এ বিষয়ে অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, চীন ব্যক্তিগত পর্যায়ে জানিয়েছে যে বর্তমানে তারা কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা করতে আগ্রহী নয়।
এর আগে গত অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন দুই দেশ তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে সম্মত হয়। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শতভাগের বেশি শুল্ক আরোপ করেছিল এবং চীন বিশ্ববাজারে বিরল খনিজ সরবরাহ সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল।
এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, বিশ্বব্যাপী আমদানিপণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা অনেক শুল্ক আইনগতভাবে বৈধ নয়। তবে ট্রাম্প ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি বিকল্প আইনি পথ ব্যবহার করে নতুন করে কিছু শুল্ক আরোপ করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠক শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রঃ রয়টার্স