মেলবোর্ন, ২৪ মে- রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর একটি জাতীয় সংসদ ভবন। অথচ সেই সংসদ ভবনের স্টোররুম থেকেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বাসবার। সরকারি হিসাবে যার মূল্য প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা। ঘটনার তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের গাফিলতি, নথিতে অসংগতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় অবস্থিত চারটি সাব-স্টেশনের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল উন্নয়ন কাজ পায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড। কাজের আওতায় নতুন এলটি ও ইএলটি প্যানেল, বাসবার ট্রাঙ্কিং ও জিআইএস প্যানেল স্থাপনের কথা ছিল।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়, কাজ শেষে পুরোনো ১ হাজার ৪০৯টি কপার বার উদ্ধার হয়। এর মধ্যে ৬৬টি পুনরায় ব্যবহার করা হলেও বাকি ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বার স্টোরে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্টোর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ কপার বারের কোনো অস্তিত্ব নেই।
ঘটনার পরপরই চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের গাফিলতির বিষয়টি উঠে আসে। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, একই প্রকল্পের জন্য দুইবার সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা হয়। কিন্তু দুটি রিপোর্টের মধ্যে ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে। কোথাও তারিখ নেই, কোথাও স্বাক্ষর নেই, আবার কোথাও কপার বারের সংখ্যা ও মূল্য আলাদা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অনিয়ম ও মালামাল গায়েবের ঘটনা আড়াল করতেই এসব নথি তৈরি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন, মাত্র পাঁচ মাস দায়িত্বে ছিলেন এবং তাকে কখনো স্টোরের মালামাল বা প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এমনকি স্টোরে কী পরিমাণ কপার বার ছিল, সে সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন না।
অন্যদিকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ দাবি করেছেন, কিছু কর্মচারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে কপার বার বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী নুরুন নবী সুজন বলেছেন, অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও তাদের প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল কম দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তারা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালিকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে কি না বা কপার বার চুরির বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না।
সংসদ ভবনের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থাপনা থেকে এত বিপুল পরিমাণ ভারী কপার বার কীভাবে গায়েব হলো, তা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, এটি শুধু চুরির ঘটনা নয়, বরং এর আড়ালে বড় ধরনের প্রকল্প দুর্নীতির যোগসূত্রও থাকতে পারে।