ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ব, ২৫ মে- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। তবে এখনই কোনো চুক্তি হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেছে দেশটি।
সোমবার সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আলোচনাধীন বিভিন্ন বিষয়ের একটি বড় অংশে দুই পক্ষ সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এটিকে চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “আলোচনার বেশ কিছু বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছি, এটা সত্য। কিন্তু এখনই বলা যাবে না যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করা কেবল সময়ের ব্যাপার।”
ইসমাইল বাঘাই আরও জানান, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে এবং বেশ কিছু বিষয়ে সাধারণ সমঝোতা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অমীমাংসিত রয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ সময় রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, খুব শিগগিরই ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি ঘোষণা করা হতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দেন, সম্ভাব্য সমঝোতার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়টিও থাকতে পারে।
একইদিন ভারতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, বিশ্ববাসী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুখবর পেতে পারে। তবে পরে রাতে ট্রাম্প জানান, তিনি আলোচনায় তাড়াহুড়া করতে চান না।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আগেই ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, ইরানের লক্ষ্য প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক বা প্রাথমিক রূপরেখা চুক্তি তৈরি করা। এরপর ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
যদিও উভয় পক্ষ সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান দেখাচ্ছে, তবু এখনো স্পষ্ট নয় কোন পক্ষ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, অবরুদ্ধ সম্পদ ছাড় এবং লেবানন পরিস্থিতি।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইসমাইল বাঘাই জানান, এটি প্রাথমিক রূপরেখা চুক্তির অংশ নয়। বরং পরবর্তী ধাপে আলাদা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে।
তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগের বিষয়ে দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি এবং তাসনিম নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, তেহরান এখন পর্যন্ত ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে নেওয়া, পারমাণবিক সরঞ্জাম অপসারণ কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও জটিলতা রয়ে গেছে। ইরান বলছে, তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সময় তাদের সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি নিতে হবে। ফার্স নিউজের দাবি, সম্ভাব্য চুক্তি হলেও কৌশলগত এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।
তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাবে না। একইসঙ্গে তারা বলেছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাসনিম নিউজের দাবি, তেহরান চায় অন্তত আংশিক অবরুদ্ধ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত না হলে কোনো প্রাথমিক সমঝোতা হবে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আটকে থাকা বাকি অর্থ পর্যায়ক্রমে ছাড়ের নিশ্চয়তাও চায় ইরান। একইসঙ্গে ফার্স নিউজ জানিয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতার আওতায় আলোচনা চলাকালেই ইরানের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে।
লেবানন পরিস্থিতিও আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরায়েল প্রতিনিয়ত ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির আগে যে সমঝোতা স্মারক ঘোষণা করা হবে, সেখানে লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উল্লেখ থাকবে।