কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কর্ণফুলীতে নৌকাডুবি: খোঁজ মিলছে না নববধূ কনিকা দাসের
মেলবোর্ন, ২৮ মে- চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীতে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় কনিকা দাশ (১৯) নামে এক নববধূ নিখোঁজ হয়েছেন। তবে স্থানীয় চার…
মেলবোর্ন, ২৭ মে- “কখনো কখনো শুধু একটি সরকারের পতন হয় না, বদলে যায় পুরো একটি অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য।” সাম্প্রতিক বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে গেলে এই কথাটিই যেন সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতা হারানো, পরবর্তীতে তার ভারতে আশ্রয় নেওয়া, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর এবং পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক উত্থান দেশটিকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দাবার ছকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে একইসঙ্গে শুরু হয়েছে আরও অনিশ্চিত, জটিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল একটি নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশকে অনেক সময় ছোট বা প্রান্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশটির রয়েছে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার, বছরে ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথ এবং ভারত, চীন, মিয়ানমার ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বলয়ের সংযোগস্থলে অবস্থান। ফলে ঢাকায় ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বদলে যায় পুরো অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণ।

শেখ হাসিনা। ছবিঃ সংগৃহীত
ভারতের উদ্বেগ ও নতুন হিসাব
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন সবচেয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনা ছিলেন নয়াদিল্লির অন্যতম নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক অংশীদার। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগে হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
তাই তার পতনের পর ভারতকে নতুন বাস্তবতায় নিজেদের কৌশল পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা, হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ বেড়েছে।
ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং তাদের কৌশলগত নিরাপত্তার একটি অংশ। ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়ে কলকাতা, আসাম, ত্রিপুরা এবং সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতে।

মার্কিন কূটনীতিকের বাসভবনে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা তৈরি হয় , ছবি : সংগৃহীত
চীনের চোখে বাংলাদেশ
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। বেইজিং বাংলাদেশকে দেখছে মূলত অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশের বন্দর, জ্বালানি খাত, অবকাঠামো, উৎপাদনশিল্প এবং বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় গত এক দশকে বাংলাদেশে একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশকে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয় চীন।
এছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে বাংলাদেশে ৩৫টি বিআরআই প্রকল্পে প্রায় ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে বেইজিং এবং চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ২২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারের কাজ পেয়েছে।
চীনের কাছে স্থিতিশীল বাংলাদেশ মানে বঙ্গোপসাগরে একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি কৌশলগত অবস্থান। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বা বিভক্ত বাংলাদেশ ভারতীয় প্রভাব বৃদ্ধি কিংবা পশ্চিমা হস্তক্ষেপের সুযোগও তৈরি করতে পারে বলে মনে করে বেইজিং।

শেখ হাসিনা, ছবিঃ সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও ভূরাজনীতি
বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বরাবরের মতোই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটনের দৃষ্টি শুধু রাজনৈতিক নয়, ভৌগোলিকও।
বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে চীন, ভারত, মিয়ানমার এবং এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ মিলিত হয়েছে। ফলে ঢাকার প্রতিটি নির্বাচন, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক সংকট বৃহত্তর মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক যোগাযোগপথ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নীরব কিন্তু সক্রিয় রাশিয়া
বাংলাদেশ ইস্যুতে রাশিয়া তুলনামূলকভাবে নীরব থাকলেও তারা মোটেও অনুপস্থিত নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখা, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পশ্চিমা আধিপত্যের বাইরে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কৌশলের অংশ হিসেবেই মস্কো বাংলাদেশকে দেখছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ একাধিক বড় প্রকল্পে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। মস্কোর জন্য বাংলাদেশ সরাসরি নিয়ন্ত্রণের জায়গা নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানচিত্র। ছবিঃ সংগৃহীত
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন পাকিস্তানও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শুধু কূটনৈতিক হিসাব নয়, এর পেছনে রয়েছে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। সেই ইতিহাস এখনো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। ইসলামাবাদ বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারত-চীন-পাকিস্তান ত্রিভুজের অংশ হিসেবেই মূল্যায়ন করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অতীত কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। এখানে ইতিহাসও ভূরাজনীতির অংশ হয়ে থাকে।
নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা কি প্রতিশোধ, বিভাজন ও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
নির্বাচনী বিজয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে থেকেই জাতীয় পুনর্মিলন, ন্যায়বিচার কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে না। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে এখনো রয়েছে রাজনৈতিক বিভক্তি, উদ্বিগ্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, পুনর্গঠিত বিরোধী শক্তি, সক্রিয় তরুণ সমাজ এবং আস্থাহীন অর্থনীতি।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, দেশটি যেন প্রতিশোধমূলক রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা বিদেশি প্রভাবের নতুন পরীক্ষাগারে পরিণত না হয়।
ভারসাম্যের দড়ির ওপর বাংলাদেশ
বাংলাদেশ এখন কার্যত এক ধরনের কৌশলগত ভারসাম্যের দড়ির ওপর হাঁটছে। দেশটি যদি ভারতের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তাহলে চীন সতর্ক হবে। আবার চীনের দিকে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ হলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বৈশ্বিক শক্তিগুলো বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে। কখনো পরামর্শের নামে, কখনো ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে, আবার কখনো মানবাধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
নতুন অধ্যায়ের সামনে বাংলাদেশ
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশকে এখন অনেকটাই এমন একটি গণতন্ত্রের মতো দেখাচ্ছে, যা আবার শ্বাস নিতে শুরু করেছে। কিন্তু শুধু শ্বাস নেওয়া মানেই সুস্থ হয়ে ওঠা নয়।
বাংলাদেশকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তারা কি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে, নাকি শুধু একটি রাজনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠীর জায়গায় আরেকটি গোষ্ঠী বসবে।
কারণ শেখ হাসিনার পরবর্তী বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়। এটি বঙ্গোপসাগরের, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের এবং সেই বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অংশ, যেখানে মানচিত্র বদলাতে শুরু করলে বড় শক্তিগুলো কখনো দেরি করে না।
বাংলাদেশ এখন এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে টিকে থাকার জন্য শুধু ক্ষমতা পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কৌশলগত ভারসাম্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার সক্ষমতা।
সূত্রঃ Pressenza
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au