নতুন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে কমেছে জাহাজ চলাচল
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও…
মেলবোর্ন, ২৯ মে- কলকাতায় কোরবানির ঈদ বরাবরই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহেরও একটি বড় অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবে চলতি বছরের ঈদে সেই পরিচিত চিত্রে এসেছে বড় পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার ঈদের নামাজ, কোরবানির আয়োজন, প্রশাসনিক নজরদারি এবং জনপরিসরে ধর্মীয় কার্যক্রম ঘিরে দেখা গেছে এক ভিন্ন বাস্তবতা।
দীর্ঘদিনের প্রচলিত রেওয়াজ ভেঙে এবার কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। তার বদলে নামাজের আয়োজন করা হয় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। একইসঙ্গে রাজ্যজুড়ে কড়া পুলিশি নজরদারি, প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং রাস্তা দখল করে ধর্মীয় আয়োজন না করার সরকারি অবস্থান এবারের ঈদকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
ঈদের সকালে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নামাজ পড়তে এসে স্মৃতিচারণ করছিলেন কলকাতার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে রেড রোডে ঈদের নামাজ পড়তে আসতেন। তখন থেকেই ঈদের সকাল মানেই ছিল রেড রোডের জামাত। এবার জায়গা বদলে গেলেও সেই স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে।
ব্রিগেডে নামাজ শুরুর আগে সকাল সাড়ে আটটার দিকে মাঠের একপাশে বসে থাকা অনেকেই বলছিলেন, পরিবেশ শান্ত ও সুশৃঙ্খল হলেও আগের মতো আবেগ অনুভব করছেন না। কেউ কেউ আবার নতুন ব্যবস্থাকে ইতিবাচক বলেও মন্তব্য করেছেন।
রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ধর্মীয় জমায়েত ও পশু জবাই নিয়ে একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার ঘোষণা দেয় সরকার। ওই আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড় বা বলদ জবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট বয়স ও স্বাস্থ্যসনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইসঙ্গে নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে পশু জবাই এবং প্রকাশ্যে কোরবানি নিষিদ্ধ করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।

ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঈদের নামাজের অনুষ্ঠান নিয়ে অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ছবিঃ সংগৃহীত
ঈদের আগে থেকেই এসব পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেকের আশঙ্কা ছিল, কোরবানির পশুর বাজারে এর বড় প্রভাব পড়বে। বাস্তবেও সেই প্রভাব দেখা গেছে। কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন পশুর হাটে এবার তুলনামূলক কম বেচাকেনার খবর পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিক্রেতাই গরু নিয়ে বাজারে আসতে সাহস পাননি। অন্যদিকে অনেক ক্রেতাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য।
রাস্তা আটকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান না করার সরকারি সিদ্ধান্তও বিতর্ক তৈরি করেছে। এর প্রতিবাদে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভও হয়। বিশেষ করে রাস্তায় নামাজ পড়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় কোরবানির ঈদ। তবে এবারের ঈদে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন ছিল রেড রোডের বদলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নামাজের আয়োজন।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময়ে রেড রোডের ঈদের জামাত রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে রোজার ঈদে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়মিত সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা যেত। মঞ্চ থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও দিতেন।
তবে এবার ব্রিগেডের জামাতে কোনো মন্ত্রী বা শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে দেখা যায়নি। আয়োজনটিকে মূলত ধর্মীয় পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নামাজের আয়োজনকে ঘিরে আগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়। নামাজে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই বলছিলেন, জায়গা বড় হওয়ায় ভিড় সামলাতে সুবিধা হয়েছে।
ঝাড়খণ্ড থেকে বহু বছর আগে কলকাতায় আসা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে রেড রোডে ঈদের নামাজ পড়ে আসছেন। তবে এবার নতুন জায়গায় কী পরিস্থিতি হবে তা বুঝতে না পেরে প্রথমে এলাকার মসজিদে নামাজ পড়ে পরে ব্রিগেডে আসেন।
নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ব্রিগেডে জায়গা বেশি হওয়ায় নামাজ পড়তে সুবিধা হয়েছে। আগে রেড রোডে ভোরে এসে জায়গা দখল করতে হতো এবং যানজটও তৈরি হতো।
গত বছরই রেড রোডে ঈদের নামাজ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। কারণ ওই এলাকা সেনা নিয়ন্ত্রিত। পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সেখানে নামাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার কলকাতা পুলিশ আগেভাগেই আয়োজকদের বিকল্প জায়গা খুঁজতে বলেছিল। পরে সেনাবাহিনীর অনুমতিতে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড চূড়ান্ত করা হয়।
আয়োজক ক্যালকাটা খিলাফত কমিটির সদস্য মোহাম্মদ খলিল জানান, অতীতের তুলনায় এবার নামাজে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। তার মতে, অনেকে নতুন জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, আবার কেউ কেউ কোরবানির বিধিনিষেধের কারণে অন্যত্র চলে গেছেন।
ঈদের নামাজে অংশ নেওয়া অনেকেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, এখন নিয়ম মেনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে। আবার কেউ মনে করছেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত না করাটা ইতিবাচক দিক।
পিকনিক গার্ডেনের বাসিন্দা হুসেন বলেন, তারা নিয়ম মেনে ঈদ উদযাপন করছেন এবং আশা করছেন ভবিষ্যতে সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই একই নিয়ম কার্যকর হবে।
তবে বিদেশি শিক্ষার্থী উসমান শেখু ও তার স্ত্রীর কাছে এসব পরিবর্তনের বিষয়টি ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। নাইজেরিয়া থেকে আসা এই দম্পতি কলকাতায় পড়াশোনা করছেন। তারা জানান, একসঙ্গে এত মানুষের ঈদের জামাতে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের কাছে এখনও আনন্দের।
এবারের ঈদে রাজনৈতিক উপস্থিতি কম থাকলেও নিরাপত্তা নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদসহ বিভিন্ন বড় মসজিদের বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর বলেন, তিনি আগে কখনও স্থানীয় মসজিদের বাইরে এত পুলিশ ও সিআরপিএফ সদস্য দেখেননি। এলাকায় কোনো উত্তেজনা না থাকলেও এমন কড়া নিরাপত্তা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
মল্লিক বাজারে ঈদের দিন বের হওয়া মোহাম্মদ হুসেন বলেন, এবার রাস্তাঘাটে ভিড় কম ছিল, যানজটও কম ছিল, কিন্তু আগের ঈদের সেই পরিবেশ যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগণার খলিল আহমেদ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, এবার অন্তত ঈদের নামাজকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি, যা ইতিবাচক পরিবর্তন।

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবিঃ সংগৃহীত
তবে কলকাতার তপসিয়া এলাকার কিছু মানুষের জন্য এবারের ঈদ ছিল একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি ওই এলাকায় একটি ভবনে আগুন লেগে দুজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে অভিযোগ ওঠে ভবনটি অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। সরকার ভবনটি ভাঙার নির্দেশ দিলে বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে হয়। যদিও পরে আদালতের নির্দেশে ভাঙার কাজ স্থগিত হয়।
ওই ভবনের নিচে আতরের দোকান চালানো মোহাম্মদ জুনেইদ বলেন, সেখানে বহু পরিবার থাকত, কিন্তু এখন তারা কোথায় আছে কেউ জানে না। তার মতে, এবারের ঈদে এলাকায় মানুষের উপস্থিতি অনেক কম ছিল।
এক স্থানীয় রিকশাচালক বলেন, কয়েকদিন আগেও এলাকায় পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের ভিড় ছিল। এখন পরিবেশ শান্ত হলেও যাদের মাথার ওপরের ছাদ হারিয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ কথা বলছে না।
এবারের কোরবানির ঈদ কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় শুধুই একটি ধর্মীয় উৎসব ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক কড়াকড়ি, সামাজিক উদ্বেগ এবং নতুন বাস্তবতার প্রতিফলনও। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ, পরিচিত রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং জনপরিসরের পুরোনো চিত্র বদলে গিয়ে এবার ঈদ যেন এক নতুন বার্তা দিয়ে গেল কলকাতাকে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au