মেলবোর্ন, ২৯ মে- ভোরের আলো ফোটার আগেই আফগানিস্তানের ঘোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারানের একটি ধুলোমাখা চত্বরে জড়ো হন শত শত মানুষ। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তারা অপেক্ষা করছিলেন, কেউ এসে হয়তো দিনমজুরির কোনো কাজ দেবেন। কাজ পেলে সেদিন পরিবারের জন্য খাবার জুটবে, আর কাজ না পেলে সন্তানদের না খেয়েই ঘুমাতে হবে। আফগানিস্তানের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ও খাদ্যাভাবের মধ্যে দেশটির অসংখ্য পরিবারের জীবন এখন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটছে।
ওই শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা ৪৫ বছর বয়সী জুমা খান জানান, গত ছয় সপ্তাহে তিনি মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। প্রতিদিনের মজুরি ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি, যা মার্কিন মুদ্রায় আড়াই থেকে তিন ডলারের কিছু বেশি। এই সামান্য আয়ে পরিবারের খাবার জোগানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জুমা খান বলেন, তাঁর সন্তানেরা টানা তিন রাত না খেয়ে ঘুমিয়েছে। স্ত্রী ও সন্তানের কান্না সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রতিবেশীর কাছে গমের আটা কেনার জন্য ধার চেয়েছিলেন। সবসময় তিনি আতঙ্কে থাকেন, সন্তানরা অনাহারে মারা যায় কি না।
শুধু জুমা খান নন, আফগানিস্তানের লাখো পরিবার এখন একই সংকটের মুখোমুখি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রতি চারজনের তিনজনই মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। বেকারত্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং একসময় যে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর লাখো মানুষ নির্ভর করতেন, তা এখন অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিবিসির প্রতিনিধি যোগিতা লিমায়ে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন বহু বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন, যারা চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধার চাপে নিজেদের সন্তান বিক্রি করার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমানে আফগানিস্তান রেকর্ড মাত্রার খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে। প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে ঘোর প্রদেশ।
সেখানে শ্রমের সন্ধানে আসা আরেক ব্যক্তি রব্বানি বলেন, একদিন বাড়ি থেকে ফোন করে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর সন্তানরা দুই দিন ধরে না খেয়ে আছে। কথাগুলো বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করবেন। পরে ভেবেছেন, এতে পরিবারের কোনো উপকার হবে না। তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি কাজের খোঁজে বের হয়েছেন।
একই চত্বরে উপস্থিত খাজা আহমদ কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, তাঁর বড় ছেলেরা মারা গেছে। এখন বৃদ্ধ বয়সেও পরিবারের খাবারের জন্য কাজ খুঁজতে হচ্ছে। কিন্তু বয়স বেশি হওয়ায় কেউ তাঁকে কাজে নিতে চায় না।
চাঘচারানের সেই শ্রমবাজারের পাশে একটি স্থানীয় বেকারি খুললে মালিক আগের দিনের বাসি রুটি দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রুটিগুলো শেষ হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত মানুষজন এক টুকরো রুটির জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর আবার হৈচৈ শুরু হয়, যখন মোটরসাইকেলে একজন এসে ইট বহনের কাজের জন্য একজন শ্রমিক খুঁজতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ডজন মানুষ তাঁর দিকে ছুটে যান।
বিবিসির প্রতিনিধি প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেছিলেন। সেই সময়ে মাত্র তিনজন মানুষ কাজ পেয়েছিলেন।
ঘোর প্রদেশের অনুর্বর পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতে এখন দারিদ্র্যের ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে। এমনই এক গ্রামে বসবাস করেন আবদুল রশিদ আজিমি। তিনি তাঁর সাত বছর বয়সী যমজ কন্যা রোকিয়া ও রোহিলাকে পাশে বসিয়ে জানান, কীভাবে তিনি নিজের মেয়েদের বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবদুল রশিদ বলেন, তিনি এতটাই দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও অসহায় হয়ে পড়েছেন যে মেয়েদের বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো পথ দেখছেন না। প্রতিদিন কাজ শেষে তিনি ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরেন। তখন সন্তানরা তাঁর কাছে রুটি চায়, কিন্তু দেওয়ার মতো কিছুই থাকে না।
তিনি বলেন, যদি একটি মেয়েকে বিক্রি করেন, তাহলে অন্তত চার বছর পরিবারের বাকি সদস্যদের খাওয়াতে পারবেন। তিনি মেয়েদের বিয়ের জন্য বা গৃহকর্মের উদ্দেশ্যে বিক্রি করতেও প্রস্তুত বলে জানান।
মেয়েদের মা কায়হান বলেন, তাঁদের খাবার বলতে এখন শুধু শুকনো রুটি আর গরম পানি। অনেক সময় চাও জোটে না।
আফগান সমাজে ছেলেদের ভবিষ্যৎ উপার্জনকারী হিসেবে দেখা হয়। সে কারণে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বিক্রির ঘটনা বেশি ঘটছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর নারী ও মেয়েদের শিক্ষা এবং কাজের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।
আবদুল ও কায়হান দম্পতির দুই কিশোর ছেলে শহরে জুতা পালিশ করে। আরেক ছেলে আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়ায়। সেই আবর্জনা দিয়েই রান্না করা হয়।
সাইদ আহমদ নামের আরেক ব্যক্তি জানান, তিনি তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শাইকাকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শাইকার অ্যাপেন্ডিসাইটিস এবং লিভারে সিস্ট ধরা পড়ার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে তিনি মেয়েকে এক আত্মীয়ের কাছে ২ লাখ আফগানিতে বিক্রি করেন।
সাইদ বলেন, পুরো টাকা একসঙ্গে নিলে আত্মীয়টি তখনই মেয়েকে নিয়ে যেতেন। তাই তিনি শুধু চিকিৎসার খরচের টাকা নিয়েছেন। বাকি টাকা ধীরে ধীরে দেওয়া হবে এবং পাঁচ বছর পর শাইকাকে ওই আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানো হবে, যেখানে তাকে তাঁদের ছেলেদের একজনকে বিয়ে করতে হবে।
শাইকা তখন মাত্র ১০ বছরের হবে।
মেয়েকে বাঁচানোর জন্যই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান সাইদ। তিনি বলেন, অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে নিয়ে তাঁর উদ্বেগ আছে, কিন্তু অস্ত্রোপচার না করালে মেয়েটি হয়তো মারা যেত।
মাত্র দুই বছর আগেও সাইদ ও তাঁর পরিবার খাদ্যসহায়তা পেতেন। গমের আটা, রান্নার তেল, ডাল এবং শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর সেই সহায়তাও বন্ধ হয়ে গেছে।
একসময় আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় দাতাদেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু গত বছর থেকে দেশটি আফগানিস্তানের জন্য প্রায় সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাও সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলতি বছরে আফগানিস্তান যে পরিমাণ সহায়তা পেয়েছে, তা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।
এর পাশাপাশি ভয়াবহ খরার কারণে আফগানিস্তানের অর্ধেকের বেশি প্রদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে গেছে এবং সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এক গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মালিক অভিযোগ করেন, তাঁরা সরকার বা কোনো বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকেই কোনো সাহায্য পাননি।
তালেবান সরকার অবশ্য এই পরিস্থিতির জন্য আগের সরকারকে দায়ী করছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত আশরাফ গনি সরকারকে হটিয়ে তালেবান আবার ক্ষমতায় আসে।
এদিকে, অপুষ্টি ও ওষুধের অভাবে শিশুমৃত্যুও বেড়ে গেছে। মোহাম্মদ হাশেম নামের এক ব্যক্তি জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁর ১৪ মাস বয়সী মেয়ে মারা গেছে। তিনি বলেন, ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাবেই তাঁর সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, গত দুই বছরে মূলত অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
যদিও আফগানিস্তানে এসব মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। তবে স্থানীয় কবরস্থানগুলোতে ছোট ছোট কবরের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বিবিসির প্রতিনিধিরা কয়েকটি কবরস্থান ঘুরে দেখেছেন, সেখানে শিশুদের কবরের সংখ্যা বড়দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। যা দেশটির ভয়াবহ মানবিক সংকটেরই একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
সূত্রঃ বিবিসি