বাংলাদেশ

৫ আগস্ট-উত্তর বাংলাদেশ: নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলায় ভরা

মতামত- সরদার সেলিম রেজা

  • 6:50 pm - May 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৮১ বার
৫ আগস্ট-উত্তর বাংলাদেশ: নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলায় ভরা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৯ মে- ৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ভাঁজ। সেদিন থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক গতি থমকে গেল। থানা পুড়ল, পুলিশ মাঠ ছাড়ল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অসহায়তা দেখাল। যে রাষ্ট্র একসময় উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আলোচিত হচ্ছিল, সেই রাষ্ট্রেই এখন প্রশ্ন—আইনের শাসন আছে তো? নাকি মবই এখন রাষ্ট্র চালায়?

১. সহিংসতার চিত্র: দাবি ও বাস্তবতা

৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মব লিঞ্চিং, বাড়িঘর- শিল্পপ্রতিষ্ঠান  দোকান-অফিসে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন, স্থানীয় সাংবাদিক এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী:

– রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পাঁচ শতাধিক এর বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শিক্ষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি বয়স্ক নাগরিকও রয়েছেন।

– শত শত পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায় তিন হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য নির্মমভাবে ৩,৪,৫ আগস্ট এবং পরবর্তী একমাসের মধ্যে । থানা ভাঙচুর করে অস্ত্র লুট, পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করে বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ ও সেতুর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে।

– বহু জায়গায় বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমিজমা দখল হয়েছে। নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ পুকুর, খাল, বিল, নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো এখনো সরকারি তদন্তে চূড়ান্ত হয়নি। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের কান্না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বয়ান এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের রিপোর্ট একটাই কথা বলে—৫ আগস্টের পর দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

 ২. “জুলাই যোদ্ধা” আসলে কাদের বিরুদ্ধে লড়ল?

কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে  ৫ আগস্টের পর  এই আন্দোলন “জুলাই যুদ্ধ” নাম ধারণ করে। প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধ কার বিরুদ্ধে?

যদি শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে আন্দোলন কেন সহিংস পথে গেল? কেন সরকারি স্থাপনা, মেট্রোরেল, সেতুভবন, থানা পুড়ল? কেন পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে সরকার উৎখাতের চেষ্টা হলো?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, এটি ছিল কোটার আড়ালে সরকার পতনের সুপরিকল্পিত ছক। সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে পেছন থেকে পরিচালিত হয়েছে একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এটাকে “মেটিকুলাস ডিজাইন” বলা হচ্ছে—যেখানে জনরোষকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হয়েছে।

 ৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং মবের শাসন

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই হত্যা, নির্যাতন, লুটপাটের বিচার হবে কি?

পুলিশ বাহিনী যখন নিজেই আক্রান্ত, মনোবল ভাঙা, তখন নিরপেক্ষ তদন্ত কতটা সম্ভব? মামলা করতে গেলে উল্টো মামলার ভয়, কথা বললেই “ফ্যাসিস্টের দোসর” তকমা।

এই অবস্থায় রাষ্ট্রে আইনের শাসন বলে কিছু থাকে না। থাকে মবের শাসন। মব যখন রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের জায়গা দখল করে নেয় নৈরাজ্য। আর নৈরাজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ—যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, শুধু শান্তিতে বাঁচার অধিকার আছে।

 ৪. উন্নয়নের পথে ধাক্কা

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠেছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডিজিটাল বাংলাদেশ—এসব প্রকল্প আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করেছে।

৫ আগস্টের পর সেই অর্জনগুলো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মেট্রোরেল, সেতুভবন, সরকারি অফিস পুড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় পড়েছে। পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সব খাতেই স্থবিরতা নেমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি শৃঙ্খলা না ফেরে, তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স, রপ্তানি—সব সূচকেই ধস নামবে।

 ৫. সামাজিক বিভাজন ও ভয়ের সংস্কৃতি

আজ দেশে দুই ধরনের ভয় কাজ করছে। একদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ভয়ে ঘরছাড়া। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ভয়ে কথা বলতে পারছে না। ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলেই রাতারাতি “দালাল”, “দোসর” তকমা দেয় বটবাহিনীর সদস্যরা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। অথচ এরাই একসময় দেশ গড়ার কারিগর ছিলেন। আজ তাদের ওপরই চলছে হামলা, হুমকি, মামলা।

এই বিভাজন যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে জাতীয় ঐক্য বলে কিছু থাকবে না। একটি জাতি বিভক্ত হয়ে গেলে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ সহজ হয়।

৬. রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায়?

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। প্রশ্ন হলো—কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে কি গণতন্ত্র টেকে? ইতিহাস বলে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আদর্শকে মারা যায় না। বরং তা ভূগর্ভে চলে যায়, আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।

 ৭. পরিসংখ্যান ও সূচকের পতন

৫ আগস্টের পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা আশঙ্কা করছেন।

আইন-শৃঙ্খলা সূচক : খুন, গুম, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, দখলবাজির ঘটনা বেড়েছে। স্থানীয় থানাগুলো কার্যকর না থাকায় ভুক্তভোগীরা মামলা করতেও ভয় পাচ্ছেন।

বিনিয়োগ সূচক : বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছেন। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

মানবাধিকার সূচক : মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার, বিচার পাওয়ার অধিকার। সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠেছে।  সামাজিক সম্প্রীতি সূচক : রাজনৈতিক বিভাজন সামাজিক বিভাজনে রূপ নিয়েছে। পাড়া-মহল্লায় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে।

 ৮. করণীয় কী?

১. নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন: ৫ আগস্টের পর থেকে ঘটে যাওয়া সব হত্যা, নির্যাতন, লুটপাটের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। দোষী যেই হোক, বিচার হতে হবে।

২. পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফেরানো : পুলিশকে রাজনীতিমুক্ত করে পেশাগতভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নাগরিকের নিরাপত্তা সম্ভব নয়।

৩. রাজনৈতিক সংলাপ : সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা নয়, সংলাপই সংকটের সমাধান।

৪. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : গণমাধ্যমকে ভয়ভীতি ছাড়া কাজ করতে দিতে হবে। সত্য চাপা পড়লে রাষ্ট্র অন্ধ হয়ে যায়।

৫. জাতীয় ঐক্য: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান ও গণতন্ত্রের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বিভাজন দিয়ে রাষ্ট্র চলে না।

ইতিহাস সাক্ষী—পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা দিয়ে কখনো স্থায়ী রাষ্ট্র গড়া যায় না। আজ যারা উল্লাস করছে, কাল তারাই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে পারে। দেশের মানুষের চোখে ধুলা দেওয়া যায় কিছুদিন, চিরকাল নয়।

আমরা চাই সত্য উদঘাটন হোক। প্রতিটি হত্যা ও নির্যাতনের নিরপেক্ষ বিচার হোক। রাষ্ট্র ফিরে পাক তার শৃঙ্খলা, মানুষ ফিরে পাক নিরাপত্তা। কারণ, রাষ্ট্র কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি ১৮ কোটি মানুষের।

রাষ্ট্র যদি বাঁচে, তবে রাজনীতি বাঁচবে। রাষ্ট্র যদি ভাঙে, তবে কেউই নিরাপদ থাকবে না।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

লেখক- সরদার সেলিম রেজা, কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

এই শাখার আরও খবর

গুরুতর আহত অতিরিক্ত সচিব

মেলবোর্ন, ৩০ মে- পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য শামীমুজ্জামান ফিরোজ। শুক্রবার (২৯…

গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশ নেতানিয়াহুর

মেলবোর্ন, ৩০ মে- ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। একই…

সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে বিএসএফকে ৭২১ হেক্টর জমি দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার

মেলবোর্ন, ৩০ মে- ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের অরক্ষিত অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও নিরাপত্তা জোরদার করতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে ৭২১ হেক্টর জমি হস্তান্তর করেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য…

২০২৬ সালে রেকর্ডসংখ্যক সফল পর্বতারোহী দেখল এভারেস্ট

মেলবোর্ন, ৩০ মে- বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্টে ২০২৬ সালে রেকর্ডসংখ্যক পর্বতারোহীর সফল আরোহন সম্পন্ন হয়েছে। নেপাল সরকারের পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মোট ১০০৮…

রোমানিয়ায় আবাসিক ভবনে রুশ ড্রোন আঘাত,ন্যাটোর নিন্দা

মেলবোর্ন, ২৯ মে-  ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ এবার সরাসরি ন্যাটোভুক্ত দেশ রোমানিয়ার ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউক্রেন সীমান্ত অতিক্রম করে একটি রুশ ড্রোন রোমানিয়ার একটি আবাসিক ভবনে…

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা নাসার

মেলবোর্ন, ২৮ মে-  চাঁদে স্থায়ী মানব উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নতুন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের অংশ হিসেবে রোবোটিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au