অস্ট্রেলিয়া

ইরান নিয়ে এবিসির প্রতিবেদনে বিতর্ক, ‘দমন-পীড়নের বাস্তবতা আড়াল করার’ অভিযোগ

  • 7:49 pm - May 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৬১ বার
ইরান নিয়ে এবিসির প্রতিবেদনে বিতর্ক, ‘দমন-পীড়নের বাস্তবতা আড়াল করার’ অভিযোগ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৯ মে- ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সমর্থকদের নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ঘিরে সমালোচনার মুখে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবিসি। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিবেদনে ইরানের দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বাস্তবতা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমটিকে সতর্ক করা হয়েছে, যেন তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরান সরকারের প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে না দেন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ নিয়ে এবিসির সংবাদ পরিবেশনে পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠার দিনই এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে খামেনির সমর্থক কয়েকজন ইরানির সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়, যেখানে তাঁরা নিহত ধর্মীয় নেতাকে “যুদ্ধের শিকার নন, বরং শহীদ” হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে খামেনির সমর্থকদের বক্তব্য ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ বর্ণনা দেওয়া হলেও পরে সংক্ষিপ্তভাবে ইরানে ঘটে যাওয়া গণবিক্ষোভ, হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং সিডনির স্থানীয় কাউন্সিলর টিনা কর্দরোস্তামি। তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রচারণা তুলে ধরা আর সেটিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্তিশালী করে তোলার মধ্যে পার্থক্য করা এবিসির দায়িত্ব।

স্কাইনিউজ ডটকম ডটএইউকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “সংবাদ পরিবেশনে এমনভাবে আনুগত্যের চিত্র তুলে ধরা হলে এটি ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে, বিশ্বজুড়ে ইরানিদের কাছে এখনও এই শাসনব্যবস্থার ব্যাপক নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। অথচ বাস্তবে প্রবাসী ইরানি সমাজ নিজেই বিভক্ত।”

তিনি আরও বলেন, ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতা মানে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতি নৈতিক অস্পষ্টতা তৈরি করা নয়। তাঁর মতে, খামেনিকে ঘিরে শোক প্রকাশের যেকোনো প্রতিবেদনেই মৃত্যুদণ্ড, নারীদের দমন, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং সীমান্ত পেরিয়ে চালানো নিপীড়নের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বে তুলে ধরা উচিত ছিল।

টিনা কর্দরোস্তামির অভিযোগ, এবিসি ইরানকে “শাসকগোষ্ঠীর প্রতীকী দৃষ্টিভঙ্গি” দিয়ে দেখিয়েছে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে দমন-পীড়ন, কারাবন্দিত্ব ও সহিংসতার শিকার হওয়া লাখো ইরানির বাস্তব অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

তিনি বলেন, “অনেক ইরানি আদর্শিক আনুগত্য থেকে শোক প্রকাশ করছেন না। বরং ভয়, জোরজবরদস্তি, অস্থিতিশীলতা কিংবা বিকল্প না থাকার কারণেই তারা এমন অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এই সূক্ষ্ম বাস্তবতা প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।”

এবিসির প্রতিবেদনের একটি অংশে খামেনির “অনিশ্চিত উত্তরাধিকার” নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখানে বলা হয়, তিনি চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। এমনকি তাঁকে “নরম স্বভাবের ধর্মতাত্ত্বিক” হিসেবেও বর্ণনা করা হয়, যিনি একটি শক্তিশালী সামরিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।

তবে সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিবেদনে হামাস, হিজবুল্লাহ কিংবা হুথিদের মতো সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়নি, যাদের বিরুদ্ধে বহু দেশ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলে।

প্রতিবেদনে সরকারের সমালোচক হিসেবে যাঁদের বক্তব্য নেওয়া হয়, তাঁরা মূলত অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক নিপীড়ন কিংবা সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়গুলো তেমনভাবে উঠে আসেনি।

এই বিতর্ক দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার সিনেটের পরিবেশ ও যোগাযোগবিষয়ক কমিটির শুনানিতে লিবারেল সিনেটর সারা হেন্ডারসন এবিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি জানতে চান, কেন প্রতিবেদনে ইরান সরকারের অধীনে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, মৃত্যুদণ্ড ও গণহত্যার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

জবাবে এবিসির সম্পাদকীয় পরিচালক গ্যাভিন ফ্যাং বলেন, প্রতিবেদনের শুরুতেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, সাংবাদিকেরা ইরান সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিবেশে কাজ করছিলেন এবং সরকারি তত্ত্বাবধানে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, “দর্শকদের কাছে পরিষ্কার করা হয়েছিল যে, এটি এমন একটি প্রতিবেদন, যেখানে ইরান সরকার সাংবাদিকদের যা দেখাতে চেয়েছে, সেটিই তারা দেখেছেন। তবে সরকারের নিজস্ব জনগণের কাছে কী ধরনের প্রচারণা উপস্থাপন করা হয়, সেটিও দেখানো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারবিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিরোধী সমর্থকদের বিরুদ্ধে দমন অভিযানকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ “মানবাধিকার বিপর্যয়” হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

সে সময় সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের পরিচালক সারা লিয়া হুইটসন বলেছিলেন, “ইরান সংস্কারপন্থী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস ও নির্বিচার দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। এতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

২০০৯ সালের জুনে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভ বন্ধ না হলে সংস্কারপন্থী নেতাদের সহিংসতার জন্য দায়ী করবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন। এরপরই বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর অভিযান শুরু করে।

এ ছাড়া ২০২২ সালে ইরানের বাধ্যতামূলক হিজাব আইন ভঙ্গের অভিযোগে মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করে নৈতিকতা পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, হেফাজতে তাঁকে মারধর করা হয় এবং পরে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যু ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয় এবং আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

সূত্রঃ স্কাই নিউজ

এই শাখার আরও খবর

উৎসবের মঞ্চে ঐতিহ্য ও মানবিকতার মেলবন্ধন, ‘মহাশক্তি সম্মান’-এ স্বীকৃতি ২৫ দুর্গাপুজোর

দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক অবদান ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিতে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ২৫টি দুর্গাপুজো কমিটিকে ‘মহাশক্তি সম্মান’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ‘উই আর দ্য কমন…

পারিবারিক বন্ধুর হামলায় পা হারালেন অস্ট্রেলিয়ার নারী এমপি, সর্বশেষ যা জানা যাচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ায় স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্য হেলেন হেইন্সকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে হামলাকারীর পরিচয় ঘিরে। ৬৫ বছর বয়সী এই এমপির ওপর…

ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা

ইরানে আবারও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ…

যুদ্ধ এড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল পাকিস্তান ও কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে…

বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন

শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস, ঢাকের মধুর বাদ্য আর চারদিকে উৎসবের আমেজ—এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।…

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au