নিজ এলাকার জন্য রাজস্ব তহবিল থেকে ২৫ কোটি টাকা নিয়েছেন আসিফ-হাসনাত
মেলবোর্ন, ৩১ মে- কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক…
মেলবোর্ন, ৩০ মে- দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত হাম এবং হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে দেশে ৫৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, গত প্রায় ১০ সপ্তাহে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫৭ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। এরপর ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমে হামের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য প্রকাশ করে আসছে। এসব তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ প্রতিবেদিত সপ্তাহ অর্থাৎ ১৮ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত সাত দিনে ৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৬ মে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সংক্রমণের হার কিছুটা কমলেও হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে মৃত্যুর প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৭৩২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ঈদের ছুটি চলমান থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ ছুটির সময় সাধারণত অনেক মানুষ হাসপাতালে যেতে অনীহা দেখান কিংবা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন। ফলে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র অনেক সময় পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না। দেশে ২৫ মে থেকে ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে, যা ৩১ মে পর্যন্ত চলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সংক্রামক রোগের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা নয়, মৃত্যুর হারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, নজরদারির দুর্বলতা কিংবা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতির কারণে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক সময় কম দেখাতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা সাধারণত পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা তুলে ধরে।
যুক্তরাজ্যের কেইল বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল হায়দার বলেন, কোনো মহামারি বা প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রবণতা সংক্রমণের প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বোঝার অন্যতম নির্ভরযোগ্য সূচক। বর্তমানে বাংলাদেশে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। বরং সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালে সময়মতো টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়া, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার বৃদ্ধি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ কার্যক্রমে ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা হামের ব্যাপক বিস্তারের অন্যতম কারণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৯ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময়কে হামের ১৪তম সংক্রমণ সপ্তাহ হিসেবে ধরা হয়েছে। ওই সপ্তাহে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৩৬ জন। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯৯২ জনে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতেও সংক্রমণের হার উচ্চমাত্রায় অব্যাহত থাকে। ১২ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬তম সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৭৯৩। এরপর টানা দুই সপ্তাহ আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজারের বেশি ছিল। ৩ থেকে ৯ মে পর্যন্ত ১৯তম সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ১৯০ জনে পৌঁছায়, যা ছিল এ সময়ের সর্বোচ্চ। পরবর্তী সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে ৯ হাজার ৮৬৪ জনে দাঁড়ালেও ১৭ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ২১তম সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৭২৩ জন।
সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর হারও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৪তম সপ্তাহে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯ জন। পরবর্তী সপ্তাহে তা বেড়ে ৫৩ জনে পৌঁছে যায়। এরপর সপ্তাহভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং ২১তম সপ্তাহে এসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১২ জনে। বর্তমানে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে ৫৭৫-এ পৌঁছেছে।
হামের বিস্তার রোধে সরকার গত ৫ এপ্রিল সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের সব জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, শুধু টিকাদান দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শুরুতে টিকাদান কার্যক্রম মূলত নির্দিষ্ট কেন্দ্রভিত্তিক ছিল। অতীতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার যে কার্যকর ব্যবস্থা ছিল, এবার তা দেখা যায়নি। পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। ফলে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হাম শিশুদের জন্য সবচেয়ে সংক্রামক ও বিপজ্জনক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকের শরীরে আগের সংক্রমণ বা টিকার কারণে প্রতিরোধক্ষমতা থাকলেও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সেই সুরক্ষা অনেক কম থাকে।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মানুষের ব্যাপক চলাচলের ফলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেসব অঞ্চলে যাওয়া-আসার কারণে সুস্থ শিশুরাও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, এমন একটি সংক্রমণ পরিস্থিতিতে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের কোনো দৃশ্যমান প্রচার কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, “মনে হচ্ছে যেন কোথাও কিছুই ঘটছে না। এই উপেক্ষা করার সংস্কৃতি সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ ও মৃত্যুর বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। তাই দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ, কার্যকর নজরদারি, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে হামের এই ভয়াবহ প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au