ইরানি হামলায় সব ফ্লাইট বাতিল করল ইজিপ্টএয়ার
মেলবোর্ন, ৪ জুন- কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুই দিনের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে মিসরের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা…
মেলবোর্ন, ৩ জুন- মৃত্যুকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরপেক্ষ শক্তি মানি। সে রাজা দেখে না, ফকির দেখে না। ক্ষমতার চেয়ার দেখে না, মাটির ঘর দেখে না। কাফনের সাদা কাপড় পরার পর সব মানুষ সমান। জানাজার কাতারে ইমামের পেছনে যখন হাজারো মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, তখন বোঝা যায় না কে মন্ত্রী আর কে দিনমজুর, কে ধনী আর কে গরিব। এই দৃশ্যই আমাদের শেখায়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, অহংকার অর্থহীন, হিংসা-বিদ্বেষ নিষ্ফল।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় মৃত্যুও সেই শিক্ষা দিতে পারছে না। বরং মৃত্যুর পরেও আমরা মানুষকে আলাদা করছি। লাশের সামনে দাঁড়িয়েও দলীয় পরিচয় খুঁজছি। রাষ্ট্রীয় সম্মান, শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা, সংসদ ভবনে জানাজা—এগুলোও এখন দলের হিসাব-নিকাশে আটকে যাচ্ছে। যে সমাজে মৃত্যু মানুষকে এক করতে পারে না, যে রাষ্ট্রে মৃত্যুও বিভেদের রেখা মুছতে পারে না—সেই সমাজকে স্বাভাবিক বলব কী করে?
৫ আগস্টের পর প্রতিহিংসার রাজনীতি
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে ভয়ংকর প্রতিহিংসার সংস্কৃতি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মী মারা গেলেই ঠিকমতো লোক জমায়েত করে জানাজা পড়তে দেওয়া হচ্ছে না। ইউনুসের জামাত-শিবিরের মব বাহিনী যে ধারা চালু করেছিল, বিএনপি সরকারও আজ সেই একই পথে হাঁটছে। লাশের জানাজায় বাধা দেওয়া, শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষকে ছত্রভঙ্গ করা—এখন রুটিন হয়ে গেছে। মৃত্যুও যেখানে দলীয় ট্যাগ পায়, সেখানে মানবিকতা হারিয়ে যায়।
অথচ ইতিহাস সাক্ষী—আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর মৃত্যু হলে, যত বাধাই আসুক, সব বাধা দূর করে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ জমায়েত হয়। কাফনের কাপড়ে জড়ানো প্রিয় নেতার মুখটা একবার দেখার জন্য, শেষ শ্রদ্ধাটুকু জানানোর জন্য মানুষ ঘর ছেড়ে বের হয়। নদী পাড়ি দেয়, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে। কারণ এই মানুষগুলো জানে—মৃত্যুর সামনে দল নাই, মৃত্যুর সামনে শুধু মানুষ আছে। এই ভালোবাসা, এই কৃতজ্ঞতাবোধই প্রমাণ করে জনগণ এখনো মনুষ্যত্ব ভোলেনি।
১ জুন ঢাকা, ২ জুন ভোলা: ভালোবাসার ঢল
১ জুন, ২০২৬। মাগরিবের নামাজের পর ঢাকার ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদে বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের মুজিব বাহিনীর প্রধান তোফায়েল আহমেদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কত বাধা, কত নিষেধাজ্ঞা—তবুও মানুষের ঢল ঠেকানো যায়নি।
পরদিন ২ জুন ভোর থেকেই ভোলায় মানুষ আসতে শুরু করেছে। জনগণের প্রিয় নেতার মুখটা শেষবার দেখার জন্য, শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। লক্ষাধিক লোক জানাজায় উপস্থিত ছিল। নদী পাড়ি দিয়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে। কারণ মানুষ কৃতজ্ঞতা ভোলে না।
তোফায়েল আহমেদ কে ছিলেন? তিনি শুধু একজন সাবেক মন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন ছাত্র রাজনীতির আইকন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে গণজোয়ার উঠেছিল, তার সামনের সারির সেনাপতি ছিলেন তিনি। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম”—এই ডাকে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন সর্বশক্তি দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেবে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য। ভোলার মানুষ তাকে ‘দরদী নেতা’ বলে ডাকে। তার একটা কথা আজও মানুষের মুখে মুখে—“যে দলেরই হোক, পড়ালেখা করে পাস করলে চাকরি দিতেন তোফায়েল আহমেদ”। তিনি দল দেখেননি, মেধা দেখেছেন।
এমন একজন মানুষের লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিতে দেওয়া হলো না। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা পড়তে দেওয়া হলো না। রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়া হলেও, শহীদ মিনারে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা আর সংসদ ভবনে জানাজা—সেই প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হলো না। অথচ এই প্রটোকলগুলো কার জন্য? যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, তাদের জন্য না?
দ্বিচারিতার ইতিহাস
প্রশ্নটা তাই খুব তীব্রভাবে সামনে আসে—জনগণ হাদির জানাজা যদি জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পড়ানো যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে কবর দেওয়া যায়, তাহলে তোফায়েল আহমেদের অপরাধটা কোথায়? হাদি সাহেবের পরিচয় কী? অশ্লীল স্লোগানের জন্মদাতা। আর তোফায়েল আহমেদ? তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ৭১-এর রণাঙ্গনের সৈনিক। তাহলে কেন এই বৈষম্য?
ইতিহাসের পাতা উল্টালেই আরও বেদনার ছবি ভেসে ওঠে। বিএনপির সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার জানাজা জাতীয় সংসদ ভবনে হয়েছে। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গেছে—তাও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। কারণ তখনও রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার ছিল, রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল।
বাংলার অগ্নিকন্যার অসম্মান
বাংলাদেশের অগ্রণী কন্যা, খ্যাতিমান বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মতিয়া চৌধুরীর জানাজাও জাতীয় সংসদ বা জাতীয় শহীদ মিনারে নিতে দেওয়া হয়নি। জানাজায় সাধারণ মানুষ আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কবরের জন্য আলাদা জায়গাও ঠিকমতো দেওয়া হয়নি।
মতিয়া চৌধুরী ছিলেন বাংলার অগ্নিকন্যা। যে নারী সারাজীবন কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের জন্য লড়েছেন, যার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বাজত—তার শেষ বিদায়েও রাষ্ট্র পাশে দাঁড়ায়নি। মতিয়া চৌধুরীর মতো নেতা আর আসবে না। কারণ ত্যাগের রাজনীতি এখন নাই।
কবে বন্ধ হবে এই অপসংস্কৃতি?
রাজনীতির এই অপসংস্কৃতি তখনই বন্ধ হবে যখন মানবিকতা ফিরে আসবে, ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরে আসবে, রাজনীতি আবার আদর্শের জায়গায় ফিরবে। ৫ আগস্টের পর যা হচ্ছে—গ্রেফতার, মামলা, জানাজায় বাধা—এটা প্রতিহিংসার চাষাবাদ। আর প্রতিহিংসার ফসল কখনো মিষ্টি হয় না।
মৃত্যু যেখানে বিভেদ রেখা মুছতে পারে না, সে সমাজকে স্বাভাবিক বলা যায় না। তোফায়েল আহমেদের মতো নেতা, মতিয়া চৌধুরীর মতো অগ্নিকন্যা—তারা চলে গেছেন। কিন্তু তাদের আদর্শ রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে আমাদের লজ্জা।
ইতিহাস একদিন সব হিসাব চুকিয়ে দেবে। মৃত্যু নিরপেক্ষ হোক। রাষ্ট্র নিরপেক্ষ হোক। ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হোক। এইটুকুই চাওয়া।
লেখক- সরদার সেলিম রেজা,কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au